ঢাকার অদূরে সাভারে একটি জনবহুল শিল্পাঞ্চল এলাকা। ইদানীং এই এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের অবাধ বিচরণ দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় কুকুরের উৎপাত। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে ফজরের নামাজ পড়াও দায় হয়ে পড়েছে। কুকুরের বিশৃঙ্খল দৌড়াদৌড়ি প্রাতর্ভ্রমণকারীদের হাঁটাহাঁটিতে বিঘ্ন ঘটায়। স্কুলগামী শিশু এবং নারীরা কুকুরের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত থাকেন। ঘরের বাইরে গেলে এসব কুকুর লোকজনের ওপর আক্রমণ করে। এমনকি এসব কুকুরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গবাদিপশুও। হাসপাতালেও বাড়ছে কুকুরে কামড়ানো রোগীর সংখ্যা। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুকুরে কামড়ে আহত হয়ে সেখানে গতকাল শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) ১৩ জন কুকুরে কামড়ানো রোগী চিকিৎসা নিয়েছে।
সাভার পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে দেখা যায়, ব্যাংক কলোনি, গেন্ডা, নামা বাজার, আড়াপাড়া, আনন্দপুর, থানা রোড এলাকায় কুকুরের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে আনন্দপুর ও গেন্ডা এলাকায় দল বেঁধে ১০-১২টি কুকুর ঘোরাঘুরি করছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, সন্ধ্যা নামলেই কুকুরের উপদ্রব বাড়ছে। পথচারীদের গতিরোধ করে দাঁড়াচ্ছে কুকুরের দল। মোটরসাইকেল বা সাইকেলের পিছু নিচ্ছে।
পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের থানা খেয়াঘাট এলাকায় মো. জুয়েল নামে স্থানীয় এক হোটেল ব্যবসায়ী কালবেলাকে বলেন, গত মাসের মাঝামাঝি সময়ের দিকে আমাদের এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদিনে অন্তত ১১ জনকে কুকুরের একটি দল কামড়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে ৭-৮ বছরের বেশ কয়েকজন শিশু ছিল। যাদের নাকে ও মুখে কামড়ে দিয়েছে কুকুরের দল।
গেন্ডা এলাকার ইমু সাহেবের বালুর মাঠ নামে পরিচিত খেলার মাঠের প্রবেশদ্বার তারের জাল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, যাতে কোনো কুকুর মাঠে প্রবেশ করতে না পারে। মাঠের দায়িত্বে থাকা মো. রেজুয়ান কালবেলাকে বলেন, মাঠে খেলতে আসা ব্যক্তিদের প্রায়ই হুট করে ধাওয়া দিচ্ছে পাগলা কুকুর। এ ছাড়া মাঠে ছাগল, মুরগিকে কামড়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি ছাগলের মাথা কামড়ে দিয়েছে, তাই বাধ্য হয়ে মাঠের প্রবেশদ্বার তারের জাল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
গত মে মাসে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া এলাকার শুদ্ধ সাহা নামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে তার বাসার সামনেই কুকুরের একটি দল কামড়ে দেয়। শুদ্ধর বাবা শুভ্র সাহা কালবেলাকে বলেন, ‘চার-পাঁচটি কুকুর আমার ছেলের শরীরের নয়টি স্থান থেকে মাংস ছিঁড়ে নিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। প্রায়ই এ ধরনের ঘটনার খবর শুনতে পাচ্ছি। এর সমাধান কে দেবে। নিজে কুকুরের কামড়ে মারা গেলেও কুকুর মারা যাবে না। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।’
আনন্দপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম ফয়েজউদ্দিন খান শিহাব কালবেলাকে বলেন, কুকুরের উপদ্রবে আমরা সবাই ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ ছোট ছোট বাচ্চারা এক প্রকার ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ভয়ে একা বাসার নিচে নামতে ভয় পাচ্ছে তারা। সন্ধ্যার পর একা সড়কে বের হলেই ধাওয়া দিচ্ছে কুকুর। সাইকেল, মোটরসাইকেল দেখলে দলবেঁধে ছুটে আসে। আমার খামারের মুরগি ও ছাগলের ওপরও হামলা চালিয়েছে কয়েক দফা। এ এক ভীতিকর পরিবেশ। সংশ্লিষ্টদের প্রতি দ্রুত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় এটি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়মুল হুদা কালবেলাকে জানান, গত মে মাস থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ৭৮২ জন চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে কুকুরে কামড়ানো আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে বলেও জানালেন তিনি। রেজিস্টার দেখে জানালেন, চলতি বছরের মে মাসে ১৭৫ জন, জুন মাসে ১৫৮ জন, জুলাই মাসে ১৮২ জন, আগস্ট মাসে ২৫৪ জন এবং চলতি মাসের গত দুদিনে ২০ জনের মতো কুকুরের আক্রমণের রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে এখনো কারও জলাতঙ্ক হয়নি। আমাদের হাসপাতাল থেকে সব ধরনের টিকা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এআরভি ও আরআইজি ভ্যাকসিনও মজুত আছে।
কুকুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে সাভার পৌরসভার মেয়র আবদুল গনি কালবেলাকে বলেন, পৌরসভা একসময় কুকুর নিধন কর্মসূচি চালাত। কিন্তু আদালতের নির্দেশের কারণে তা আর করা যাচ্ছে না। তবে কুকুরের উপদ্রব খুব বেশি আকারে বেড়েছে। কুকুরের বংশবিস্তারও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আক্রান্ত কেউ আমাদের কাছে ভ্যাকসিন নিতে আসলে আমরা তাদের ভ্যাকসিন দিয়ে দিচ্ছি। কেউ ফেরত যাচ্ছেন না।
মন্তব্য করুন