মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরকান রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা দখলে নিতে জান্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়ান বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মি (এএ)। দুপক্ষের গোলাগুলি আর মর্টারশেলের বিকট শব্দে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় কাটেছে সীমান্তে বসবাসকারীদের দিন। নাইক্ষ্যংছড়ির পর এবার টেকনাফ সীমান্তের ওপারেও গোলাগুলি বন্ধ থাকায় এপার এখন শান্ত হয়েছে। কয়েক দিন শান্তিতে ঘুমাচ্ছে তারা, কেটেছে ভয়ভীতি ও আতংকও। সীমান্ত শান্ত হলেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ৯ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিছে বিজিবি। বিজিবি বলছে আর একটি রোহিঙ্গাকেও ঢুকতে দেওয়া হবে না।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী চৌকিগুলো বিদ্রোহীদের দখলে যাওয়ায় জান্তা বাহিনীর সদস্যরা মংডুর দিকে পালিয়েছে। আর বিদ্রোহীরা এদিকে দখলে নিয়ে মংডুর দিকে ছুটছে। এতে সীমান্ত থেকে সংঘর্ষ দূরে সরে গেছে বলেই গোলাগুলির শব্দ কমেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত স্বজনদের বরাত দিয় এমন তথ্যই দিচ্ছেন ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা।
তারা বলছেন, এখন মূলত মংডু শহরের আশপাশের এলাকায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই হচ্ছে। এ কারণেই সীমান্ত বরাবর গোলাগুলির তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছে।
তারা আরও বলেন, টেকনাফ সীমান্তের উত্তরাংশে হোয়াইক্য এবং পূর্ব ও দক্ষিণাংশে সাবরাং সীমান্ত। কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের ওপার থেকে গুলির শব্দ আসছিল। সে সময় হয়তো মংডুর শহরের পাশের বলিবাজার, মেগিচং, কাদিরবিল, নুরুল্লাহপাড়া, মাংগালা, নলবন্ন্যা, ফাদংচা ও হাসুরাতা এলাকা দখলে নিতে বিদ্রোহীরা সে দেশের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালায়।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সালাম বলেন, গেল কয়েকদিন আগে মিয়ানমারের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টার শেলের বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা। কিন্তু গেল দুইদিন ওপার থেকে কোনো গুলির শব্দ আমরা পায়নি। ফলে অনেকটা শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছে স্থানীয়রা।
শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা আহমেদ নুর বলেন, সোমবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার পর্যন্ত গোলাগুলি কিংবা ভারী অস্ত্রের বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায়নি। তারপরও ভয়েরে মধ্যে থাকি কখন আবার গোলাগুলি শুরু হয়।
তিনি বলেন, মিয়ানমারে সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে আমাদের জীবন-জীবিকা নিয়েও সংকটে পড়তে হয়েছে। নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে জেলেদের।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, সীমান্ত এখন অনেকটা শান্ত। সাধারণ মানুষের মাঝে আতংক কেটেছে। তারপরও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে অনুপ্রবেশকালে ৯ জন রোহিঙ্গা ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট এলাকা থেকে তাদের ফেরত পাঠানো হয়।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাতের কমে আসায় গোলাগুলির শব্দও কমেছে।
এতে টেকনাফ উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের লোকজন স্বস্তিতে রয়েছেন। এরই মধ্যে আজ (বৃহস্পতিবার) নৌকায় করে ৯ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে তমব্রু রাইট ও লেফট ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। দু-তিন দিন তীব্র লড়াইয়ের পর তমব্রু ও ঢেঁকিবনিয়া সীমান্ত চৌকি দখলে নেয় আরাকান আর্মি।
সেখানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে ঠিকতে না পেরে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত, উখিয়ার থাইংখালী, পালংখালী এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে ৩৩০ জন বিজিপি, সেনা ও বেসামরিক নাগরিক পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সাগরপথে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
এর মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামের একটি রান্নাঘরের ওপর মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে দুজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নারী ও অন্যজন রোহিঙ্গা পুরুষ। এ ছাড়া গোলাগুলিতে আহত হন আরও ৯ জন।
মন্তব্য করুন