দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বর্ষবরণের প্রধান উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বিষু (বৈসাবি)। সব মিলিয়ে মনোহরী পাহাড়ে লাগার কথা ছিল উৎবসের ছোঁয়া। কিন্তু তা বিবর্ণ করে দিয়েছে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। বান্দরবানের রুমায় একটি ও থানচি উপজেলার দুটি ব্যাংকে সশস্ত্র ডাকাতি করে পুরো পার্বত্য জেলাকে অস্থিতিশীল করে দিয়েছে তারা।
এই ঘটনায় বান্দরবানে ৬ উপজেলায় বন্ধ করে দেওয়া হয় সব ব্যাংকের কার্যক্রম। এতে বিপাকে পড়ে এসব উপজেলার লাখ লাখ মানুষ। অনেকে বেতনের টাকা উত্তোলন করে ঈদের পোশাক, বিজু, সাংগ্রাই, বিষু পালনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ফলে স্থগিতই হয়ে পড়ে সব। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৃহস্পতিবার খুলে দেওয়া হয় ৩টি শাখার কার্যক্রম।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন বান্দরবান সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ওসমান গণি। কালবেলাকে তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রুমা সোনালী ব্যাংকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে ব্যাংকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করে। ব্যাংকের ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় থানচি সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে হামলা চালায়। এ সময় প্রথম অবস্থায় সোনালী ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা শোনা গেলেও পরে গণনা করে দেখা গেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯২ টাকা নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে গ্রাহক ও কর্মচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বান্দরবানে সোনালী ব্যাংকের ৭টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি শাখার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পরে ৩টি শাখার কার্যক্রম সচল করা হয়েছে। অপহৃত ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
গতকাল দুপুরে কথা হয় রুমা উপজেলার স্কুল শিক্ষক প্রমিচিং মারমার সঙ্গে। মোবাইল ফোনে কালবেলাকে তিনি বলেন, ভেবেছিলাম বেতনের টাকা তুলে পরিবারের জন্য শপিং করব। মানসিকভাবেও প্রস্তুতি ছিল। সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু হঠাৎ এই ঝামেলার কারণে আটকে গেল সব।
রোয়াংছড়ি বাজারে কাপড়ের দোকান আছে অংসুইপ্রু তঞ্চগ্যার। কালবেলাকে তিনি বলেন, পণ্যের বাকি টাকা হিসেবে গতকাল আমার দেড় লাখ টাকা জরুরিভাবে ঢাকায় পাঠানো কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংক বন্ধ থাকায় তা পাঠাতে পারিনি। বিষয়টি সবারই জানা। কিন্তু লেনদেনের বিষয়টি একটি চেইন মেন্টেইন করে করতে হয়। আমি টাকাটা পাঠালে ঢাকার ওই ব্যক্তি অন্য আরেকজনকে দিতে পারব। সব মিলিয়ে বাজে অবস্থা গেল।
বান্দরবানের ব্যবসায়ী আমজাদ খান বলেন, আমি পর্যটনের ব্যবসা করি। এই খাতে কয়েক লাখ টাকা ইনভেস্ট করার কথা ছিল। গতকাল চট্টগ্রাম থেকে আমার জন্য টাকা পাঠানো কথা। কিন্তু তাদের কারণে আমার ব্যবসায় ধস নামল।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, কেএনএফ সন্ত্রাসীরা ব্যাংকের ভল্ট খুলতে পারেনি। বুধবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে ব্যাংকের ভল্ট খুলে সব টাকা গুনে দেখা যায়, মঙ্গলবার রাখা ১ কোটি ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকার পুরোটা রয়েছে।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, রুমা ও থানচিতে ডাকাতি, অস্ত্র লুট ও সোনালী ব্যাংক ম্যানেজারকে অপহরণের ঘটনায় পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের ওপর ক্ষুব্ধ শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। এ কারণে কেএনএফের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপ ও আলোচনায় না বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তারা এমন সমস্যা এই কর্মকাণ্ড করেছে যখন পাহাড়ে শুরু হয়েছে বৈসাবি। সামনে আসছে ঈদ। তাদের কারণে কতগুলো মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে ভাবা যায় না। এর দায় নিশ্চয়ই তাদের নিতে হবে।
এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে সোনালী ব্যাংক রুমা শাখার ক্যাশিয়ার উথোয়াইচিং মারমা বলেন, ‘ব্যাংকের ভল্টে মোট এক কোটি ৫৯ লাখ টাকা ছিল। কিন্তু ভল্ট খুলতে গেলে ক্যাশিয়ার ও ম্যানেজার দুজনের চাবির প্রয়োজন হয়। আমার মনে হয়, আমার কাছ থেকে নেওয়া চাবি দিয়ে ভল্ট খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে ওরা। এরপর ম্যানেজারের কাছে চাবি না পেয়ে তাকে হয়তো তুলে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি অফিসের পেছনে একটি দোকানে চা খেতে গিয়েছিলাম। ঈদ ও বিজু উপলক্ষে তখনও ব্যাংক খোলাই ছিল। চা দোকানে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই তিন লোক এসে আমাকে ঘিরে ফেলে। তাদের সবার হাতেই অস্ত্র ছিল। এসময় তারা আমার পকেট হাতরে ভল্টের চাবি নিয়ে নেয়। অন্যদিকে, ম্যানেজার ছিলেন মসজিদে। ব্যাংকে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ম্যানেজার পরিচয়ে তিনি এগিয়ে আসেন। তখন সন্ত্রাসীরা তাকে আটক করে।’
দুর্গম পাহাড় থেকে সদরে কেএনএফ
জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও আস্থা তৈরিতে সহায়তা দিয়ে গত বছর আলোচনায় আসে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট। এরপর দুর্গম পাহাড়ের গভীর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধাওয়া করে। একপর্যায়ে শান্তি আলোচনাও শুরু করে। এরই মধ্যে একবারেই হঠাৎ রাতের অন্ধকারে বান্দরবানের রুমা সদরের একটি ব্যাংকে হানা দিয়ে ম্যানেজারকে অপহরণ ও আনসারদের অস্ত্র লুট করে ত্রাস ছড়িয়ে দেয়। এখানেই থেমে থাকেনি। পর দিন ভরদুপুরে থানচি উপজেলার দুটি ব্যাংকে হানা দিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদী এই গোষ্ঠীটি।
গত বছর ধারাবাহিকভাবে বান্দরবানে কেএনএফবিরোধী অভিযানের পর থেকে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছিল কড়া নজরদারি। এর মধ্যে এমন দুঃসাহসিক হামলার ঘটনা ঘটল।
পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক সূত্র বলছেন, দেশের বাইরে থেকে সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি দেশের বাইরে থেকে পাহাড়ি অঞ্চলকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করছে।
ফের অশান্ত হলো এপ্রিল
গত বছরও এপ্রিল মাসে রক্তাক্ত হয়েছিল বান্দরবান। ৭ এপ্রিল রোয়াংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের খামতাংপাড়া এলাকায় একসঙ্গে পড়েছিল আট লাশ। পাহাড়ের দুই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনাতেই সেবার রক্তাক্ত হয়েছিল পাহাড়। ঘটনার পর কেএনএফ তাদের ভাটি কুকি নামে ফেসবুক পেজে দাবি করেছে, নিহত আটজনের মধ্যে সাতজন তাদের দলের সদস্য। নিহত ছয়জন উপজেলার জুরভারাংপাড়া এবং একজন পানখিয়াংপাড়ার বাসিন্দা। তবে এবার আতঙ্ক ছড়ানোর কারণ পুরোপুরি ভিন্ন।
মন্তব্য করুন