টেকনাফে (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৪, ০৮:৫২ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ১০:৫৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ঘূর্ণিঝড় রিমাল

টেকনাফে শুরু হয়েছে বৃষ্টি-দমকা বাতাস, আতঙ্কে উপকূলবাসী

টেকনাফ উপকূলে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়েছে। ছবি : কালবেলা
টেকনাফ উপকূলে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়েছে। ছবি : কালবেলা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ আরও ঘনীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড় রিমালে পরিণত হতে পারে। ঝড়ের গতিপথ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূল। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উপকূলের দিকে এগিয়ে আসায় শনিবার (২৫ মে) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন-শাহপরীর দ্বীপে বাতাস শুরু হয়েছে।

সাগর ও নাফনদের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ ফুট বেড়েছে। এতে আতঙ্কে রয়েছেন সেন্টমার্টিন-শাহপরীর দ্বীপের মানুষ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিম্নচাপটি আরও শক্তি অর্জন করে শুক্রবার মধ্যরাতে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। শনিবার বিকেলের মধ্যে সেটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। রোববার ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। আর এ সময় উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে টেকনাফ শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত সড়কের পূর্বে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাফনদের পাড়ে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া। সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। এখনো ভাঙন থেমে নেই দ্বীপে। এমনকি বিলীনের পথে দুটি বিদ্যালয়ের ভবন। এ ছাড়া গত বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেন্টমার্টিন-শাহপরীর দ্বীপ।

শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আলহাজ সোনালি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের কথা শুনলে বুক ব্যথা শুরু হয়। আমরা নাফনদের তীরে প্রায় ২০০ পরিবার বসবাস করি। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই বলে নদের ধারেই আশ্রয় নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছি। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আসার খবরে আমরা সবাই খুব চিন্তিত থাকি। কেননা গত বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোখায় আমাদের এখানকার লোকজনের ঘরবাড়ি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, ‘পুরো এলাকাটি উপকূল। প্রায় ৫০০ মানুষ নাফনদের পাড়ে জীবনযাপন করছে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রতি বছর আমার এলাকার মানুষ ঘরহারা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে সকাল থেকে বাতাস শুরু হয়েছে। ফলে নৌকা ও ট্রলারগুলো কূলে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নাফনদের পাড়ে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকাতে বলা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি দেখে তাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে জানান।’

অন্যদিকে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে সকাল থেকে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচণ্ড বাতাস শুরু করেছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা কবির আহমেদ বলেন, ‘বাতাস শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্যদিনের তুলনায় সাগর উত্তালের পাশাপাশি পানিও বেড়েছে। দ্বীপবাসীর বসবাস সাগরের পাড়ে, যার কারণে আমরা ঘূর্ণিঝড় এলে খুব বেশি ভয়ে থাকি।’

আমরা সতর্ক আছি জানিয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস জনজীবন, মনে হচ্ছে বড় কিছু হতে যাচ্ছে। দ্বীপে সাগর উত্তাল রয়েছে। সকাল থেকে আকাশ মেঘ ও বাতাস শুরু হয়েছে। এ ছাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে সাগরের পানির উচ্চতা বেড়েছে।

দ্বীপের মহিলা কোহিনুর আক্তার বলেন, ভাঙা ঘরে কোনোরকম জীবন পার করছি। এখন খুবই চিন্তিত আছি, যেন ঘূর্ণিঝড়ে শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে না যায়। গত বছর ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ঘরবাড়ি হারিয়েছি।

এ বিষয়ে টেকনাফ সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দ সাফকাত আলী বলেন, আমরা মেডিকেল টিমসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া সাগর-নাফনদের কারণে আমরা সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপকে গুরুত্ব দিচ্ছি বেশি।

ঘূর্ণিঝড়ের কোন সংকেতের কী মানে?

ঝড়ের সময় আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া সমুদ্রবন্দরের ক্ষেত্রে ১১টি সংকেত নির্ধারিত আছে। এই সংকেতগুলো সমুদ্রবন্দরের ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা বহন করে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সংকেতগুলোর বিস্তারিত-

১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত : জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে পারে। দূরবর্তী এলাকায় একটি ঝোড়ো হাওয়ার অঞ্চল রয়েছে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬১ কিলোমিটার। ফলে সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি হবে।

২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত : গভীর সাগরে একটি ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। বন্দর এখনই ঝড়ে কবলিত হবে না, তবে বন্দর ত্যাগকারী জাহাজ পথে বিপদে পড়তে পারে।

৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত : বন্দর ও বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলোর দুর্যোগকবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার হতে পারে।

৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত : বন্দর ঘূর্ণিঝড়কবলিত। বাতাসের সম্ভাব্য গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১-৬১ কিলোমিটার। তবে ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার মতো তেমন বিপজ্জনক সময় হয়নি।

৫ নম্বর বিপদসংকেত : বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতর এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে বাঁ দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

৬ নম্বর বিপদসংকেত : বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

৭ নম্বর বিপদসংকেত : বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরের ওপর বা এর কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

৮ নম্বর মহাবিপদসংকেত : বন্দর প্রচণ্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়তে পারে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা এর বেশি হতে পারে। প্রচণ্ড ঝড়টি বন্দরকে বাঁ দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।

৯ নম্বর মহাবিপদসংকেত : বন্দর প্রচণ্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা এর বেশি হতে পারে। প্রচণ্ড ঝড়টি বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।

১০ নম্বর মহাবিপদসংকেত : বন্দর প্রচণ্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হতে পারে।

১১ নম্বর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সংকেত : আবহাওয়ার বিপদসংকেত প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় আবহাওয়া কর্মকর্তা পরিস্থিতি দুর্যোগপূর্ণ বলে মনে করেন।

ঘূর্ণিঝড়ে নিরাপদ থাকতে কী করবেন?

ঘূর্ণিঝড়ের সময় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে কী করবেন, আর কী করবেন না-

১. বাড়ির কাছাকাছি থাকা মরা গাছের ডাল ছেঁটে ফেলুন। গাছের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। যাতে বাড়ির ওপর এসে না পড়ে।

২. টিনের পাতলা শিট, লোহার কৌটা যেখানে সেখানে পড়ে থাকলে এক জায়গায় জড়ো করুন। না হলে ঝড়ের সময় এর থেকে বিপদ হতে পারে।

৩. কাঠের তক্তা কাছে রাখুন যাতে কাঁচের জানালায় সাপোর্ট দেওয়া যায়।

৪. ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য জরুরি বৈদ্যুতিক যন্ত্র আগে থেকেই চার্জ দিয়ে রাখুন।

৫. হালকা শুকনো খাবার রাখুন বড়সড় বিপদের জন্য।

৬. পর্যাপ্ত পানি মজুত রাখুন।

৭. যে ঘরটি সবচেয়ে নিরাপদ সেখানে আশ্রয় নিন।

৮. বাড়ির পোষ্য ও গবাদি পশুদেরও নিরাপদ স্থানে এনে রাখুন।

৯. বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে টিভি খবরে নজর রাখুন। না হলে রেডিও চালিয়ে রাখতে পারেন।

১০. ঝড় থামতেই বাইরে বের হবেন না। অপেক্ষা করুন কারণ ঘূর্ণিঝড় চক্রাকারে ঘোরে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

ঘটনাপ্রবাহ: ঘূর্ণিঝড় রেমাল
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সেন্টমার্টিন ইস্যু নিয়ে যা বললেন ফখরুল

পাখা ছাড়া ঘুমাতে পারে না জমিদার

ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত শোলাকিয়া

বাজারের প্রধান আকর্ষণ কালো পাহাড়

ভাই হারালেন ডিপজল 

সংবর্ধিত হলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল

সিলেটে পশুর হাটে কমছে না দাম, ক্রেতাদের অপেক্ষা

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করবেন রাষ্ট্রপতি

ধাওয়া দিয়ে মাঝ নদীতে লঞ্চ থামালেন ম্যাজিস্ট্রেট

গাজীপুরে মহাসড়কে যাত্রীদের ঢল, ভোগান্তি চরমে

১০

সিলেটে ১১ ট্রাক চিনি জব্দ

১১

কোপায় ব্রাজিলের খেলা দেখবেন না রোনালদিনহো

১২

বসত ঘর থেকে হ্যাপি গোল্ড ও কিং ফিসার মদ উদ্ধার

১৩

মেয়াদ শেষেও বিমার টাকা দিচ্ছে না প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স!

১৪

কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু

১৫

টঙ দোকানের আয়ে চলছে রতন বেগমের জীবনযুদ্ধ

১৬

উত্তরের মহাসড়কে গাড়ির পেছনে গাড়ি, নেই যানজট

১৭

তাসরিফের চোখে টিউমার ধরা পড়েছে

১৮

যত্রতত্র কোরবানি করে জায়গা নষ্ট না করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

১৯

বিয়ের পর হানিমুনে না গিয়ে হজে গেলেন দম্পতি

২০
X