৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা সাজেদা বেগম। তিন সন্তানের জননী তিনি। বড় মেয়ে হাসিনা আখতার ঢাকা সোনালী ব্যাংকের এজিএম। মেঝো ছেলে মাসুদ রানা কম্পিউটার সায়েন্সে জার্মানি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। আর ছোট ছেলে মাসুদ রেজা উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করে এখন ব্যবসা করছেন।
বুক ভরা স্বপ্ন আর অসীম সাহসই তাঁর সঞ্জীবনী শক্তি। শারীরিক অসুস্থতা কিংবা বয়সের ভার কোনোকিছুই রুখতে পারেনি সাজেদা বেগমের পথচলাকে। সন্তানদের পড়াশোনা শেষ করিয়ে অবশেষে নিজে এবার হাতে তুলেছেন বই খাতা।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে এসএসসি ভর্তি পরীক্ষার হল পরিদর্শনকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার দেখতে পান সাজেদা বেগমকে।
‘বাউবির দীক্ষা: সবার জন্য উন্মুক্ত কর্মমুখী, গণমুখী ও জীবনব্যাপী শিক্ষা’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে অষ্টম/জেএসসি বা সমমানের সনদ নেই যাদের, তাদের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে এসএসসি গ্রোগামে ভর্তির সুযোগ করে দেন।
দেশব্যাপী সাজেদা বেগমের মতো সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষাবঞ্চিত আগ্রহী শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়।
সাজেদা বেগমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগে জন্ম তাঁর। আরও স্পষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বর্তমান এয়ারপোর্ট ১ নম্বর টার্মিনালেই ছিল তাদের আদি বাড়ি। নবাব হাবিবুল্লাহ গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলেন সাজেদা বেগম। স্কুলের গণ্ডি পেরুতে না পেরুতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের ইয়ং অফিসার আবুল হাসেমের সাথে। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট, বাস্তবতায় অষ্টম শ্রেণিতেই খাঁচাবন্দি হয় সাজেদা বেগমের স্বপ্ন।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির খবর পেলেন কীভাবে জানতে চাইলে সাজেদা বেগম বলেন, “একদিন ছোট ছেলে একটা পত্রিকা নিয়ে এসে বলল ‘দ্যাখছো মা কিশোরগঞ্জের বাউবি’র এই ছেলে চা বিক্রি করে এসএসসি পাস করছে, তোমার তো লেখাপড়ায় খুব আগ্রহ, তুমিও পরীক্ষা দাও। আমরা তোমার লগে আছি।” ব্যাস! সে দিন থেকেই বড় মেয়ের সাথে বাউবিতে আসা-যাওয়া। প্রথমে লজ্জা লাগলেও পরে দেখি- সব বয়সের নারী-পুরুষ এখানে বিভিন্ন প্রোগামে পড়াশোনা করে। আমার মনে শক্তি জাগল। ছোট ছেলে ও নাতি মোবাইলে ইন্টারনেটে দেখিয়ে দিল কীভাবে ক্লাস হয়, কী কী বিষয় পড়তে হয়। ভর্তি, টাকা জমা, নোটপত্র, বই সব মোবাইলে। সবকিছু এত সহজ হয়ে গেল যে, মনে হলো যেন বুক থেকে পাহাড় সরে গেল। বাউবি’র শিক্ষা ব্যবসা এত সহজ, সুন্দর! এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না। আজকে ভিসি স্যারসহ সকলে আমাকে খুব উৎসাহ, সাহস দিলেন।”
সাজেদার বড় মেয়ে হাসিনা আখতার বলেন, “আমার এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে মা ব্যাপক জনপ্রিয়। অসংখ্য মানুষের দৈনিক রোজগারের টাকা আম্মার কাছে তারা আমানত হিসেবে রাখেন। জিম্মাদার খালা নামে ডাকেন তারা। মা নকশীকাঁথা খুব সুন্দর সেলাই করেন। এক সময় বাণিজ্যিকভাবে সেলাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। মায়ের নান্দনিক সুনিপুণ কারুকাজ আমাদের বিস্মিত করে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় আদি ভাষায় অর্ধ শত বিয়ের গীত জানেন তিনি। আত্মীয়স্বজনের বিয়ের অনুষ্ঠানে এখনো ডাক পরে আম্মার।”
জীবনের শেষ বয়সে কী স্বপ্ন দেখেন জানতে চাইলে সাজেদা বেগম বলেন, ‘‘আমি অনেকদূর পড়াশোনা করতে চাই। আল্লাহ বাঁচায়ে রাখলে বাউবি থেকে এসএসসি, এইচএসসি পাস করে নকশীকাঁথা নিয়ে কাজ করে এমন একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একদিন আমি ভর্তি হব।”
জানতে চাইলে বাউবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, সাজেদা বেগম একটি সাহসের নাম। একজন অনন্যা, অপরাজিতা। শিক্ষাবঞ্চিত নারীদের আদর্শ। এদেশে অসংখ্য নারী আছেন মেধাবী কিন্তু সামাজিক, পারিবারিক চাপ, কৈশোরে বিয়ের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। বাউবির শিক্ষাক্রম সব সময় তাদের পাশে। আমরা সারা দেশেই সব বয়সের, পেশার নাগরিকের ঘরে বসে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছি। এমনকি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই, ইতালিতে অবস্থানরত বাঙালি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা সেখানে বসে এখন বাউবির বিভিন্ন প্রোগামে শিক্ষা গ্রহণ করছে।'
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘পটুয়াখালীর সাগরপাড়ের জেলে হাসান শেখ, কিশোরগঞ্জের চা বিক্রেতা হারুন মিয়া, বগুড়ার হুইল চেয়ারের যোদ্ধা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নুরজাহান রিয়া কিংবা নারী সাফ ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন সাবিনা খাতুন, মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ফটোগ্রাফার নিজামুল বিশ্বাসসহ সবাই বাউবির স্টুডেন্ট।’
মন্তব্য করুন