দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর আজ সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের ২৬ তম সম্মেলন। আসন্ন সম্মেলনকে ঘিরে ক্যাম্পাস রাজনীতির পালে যেন হাওয়া লেগেছে। শীর্ষ দুই পদ পেতে প্রত্যাশীদের ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিদ্যাপীঠে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে প্রায় দেড় ডজন নেতা ক্যাম্পাসে শক্ত অবস্থান জানান দিতে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে শোডাউনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গিয়ে চালাচ্ছেন জোর তদবির।
সোমবার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শাবাশ বাংলাদেশ মাঠে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে যারা ওপর মহলে তদবির, লোবিং কিংবা রাজনীতির মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তাদের অধিকাংশই অছাত্র, বিবাহিত, ড্রপআউট কিংবা কোনো অপকর্মের মাধ্যমে ‘বিতর্কিত’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাবি ছাত্রলীগের উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব। গালিব সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ড্রপআউট হয়ে জ্বাল সনদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও অবৈধভাবে হলে থাকছেন এই গালিব। এ ছাড়া গালিব সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদভুক্ত এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন বলেও জানা গেছে।
জানা গেছে, আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক। প্রথম বর্ষে কৃতকার্য হয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলেও গালিব দ্বিতীয় বর্ষ আর টপকাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে একাডেমিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় তার। একাডেমিক জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ড্রপআইট হন গালিব। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব না থাকলেও রাবি ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ পাওয়ার বাসনা থেকেই যায় তার। গালিব ড্রপআউট হওয়ার পরও ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ২৬তম সম্মেলনে শীর্ষ পদ পেতে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাসের ভুয়া সনদ দেখিয়ে রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রভাবশালী এক শিক্ষকের মাধ্যমেই ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ তিনি ভর্তি হন এই সান্ধ্য কোর্সে।
এদিকে শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে এমন অনৈতিক চর্চা চলতে থাকলে উভয়টিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠে শিক্ষা নিয়ে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেতা গালিব ঢাকার উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে বিবিএ পাশের নকল একটি সনদপত্র বানিয়ে গত সেশনে রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। আর নিয়মকানুন জানা সত্ত্বেও গালিবকে অবৈধভাবে সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্সে ভর্তিতে ওই বিভাগেরই প্রভাবশালী একজন শিক্ষক সহযোগিতা করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে গালিবের সান্ধ্য মাস্টার্সে ভর্তির তথ্য চাওয়া হয়। পরে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিভাগের সংশ্লিষ্ট সভাপতি অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদ ‘অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে গালিবের নিয়ে আসা বিবিএর সার্টিফিকেট যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি মারফত জানতে চান।
সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিনই অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. কামরান চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, গালিব ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেনি। এমনকি যেই রেজিস্ট্রেশন নম্বরের যে সার্টিফিকেটটি জমা দিয়ে গালিব সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছে সেটি ভুয়া এবং অসত্য।
এছাড়া গালিবের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার এবং একটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও অবৈধভাবে হলে থাকছেন এই গালিব। এ ছাড়া গালিব সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন বলেও জানা গেছে।
এদিকে আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব ড্রপআউটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘অন্য একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করে রাবির সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্য মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি।’
তবে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করে সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছেন জানতে চাইলে গালিব এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. কামরান চৌধুরী বলেন, ‘২০ বছর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এই নামে (আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব) নামে কোনো শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেনি। রাবির সংশ্লিষ্ট বিভাগের সভাপতির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছি উক্ত শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেটটি শতভাগ জাল এবং ভুয়া।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মের বাইরে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম হলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে। তারপর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে একাডেমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করবে এবং অভিযুক্তকে শাস্তির মুখোমুখি করবে।’
এদিকে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা নিয়ে এমন ছলচাতুরী কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আল মামুন বলেন, ‘এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির কালচার নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমন সত্যি হলে বিভাগের সুনামও নষ্ট হবে। সঠিক ডকুমেন্টস ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রোগ্রামে ভর্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কোর্সে ভর্তির জন্য যথাযথ যাচাই করা উচিত।’
মন্তব্য করুন