শিক্ষা এখন বৈষম্য তৈরির হাতিয়ার হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, শুধু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য নয়, নিম্নবিত্তের জন্যও শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করতে হবে।
সোমবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক এক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
সংলাপের আয়োজক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) ধারাবাহিক ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ’-এর অংশ হিসেবে এ আয়োজন করা হয়। সংলাপে অতিথি ছিলেন রাশেদা কে চৌধুরী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এজেডএম জাহিদ হোসেন।
ঢাকায় বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ফি বাড়ানোর সমালোচনা করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এমন হলে ঢাকা শহরের বস্তিতে থাকা লক্ষাধিক মানুষের সন্তানরা এসব স্কুলে পড়তে পারবে কি না। প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা তো শুধু উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তের জন্য নয়। এই বৈষম্য কেন বাড়ানো হচ্ছে। সরকার এটাকে অবৈতনিক করতে পারে।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার কারণে বৈষম্য বাড়বে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এত মানুষ প্রাণ দিল, সেখানে আবার কোটা পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আলাদা করে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। বাকি ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোথায় যাবে। এ সময় শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা না হলেও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা যেমন মানুষের অধিকার, তেমনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও মানুষের অধিকার। এটা সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আসবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা। সেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এই খাতে সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের অধঃপতনের জন্য নীতিনির্ধারকদের দায়ী করে তিনি বলেন, এই দেশের বড় সমস্যা শিক্ষিত মানুষ। অশিক্ষিত গরিব মানুষ এই দেশের বড় সমস্যা না। কারণ, ওরা কেউ এই চেয়ারে বসে না।
সংলাপে শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনস্বাস্থ্যবিদেরা অংশ নেন। কোনো সরকারই শিক্ষকদের মর্যাদা দেননি দাবি করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে হবে। বিগত সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করতে গিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে নামিয়েছিল। এরপর শিক্ষকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। একজন সচিবের নিচে একজন অধ্যাপক কেন থাকবেন, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর বৈশ্বিক বাস্তবতায়, অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশ এখন একটা ‘ক্রসরোডে’ রয়েছে। টেকঅফ করবে, নাকি মুখ থুবড়ে পড়বে, এ রকম একটা জায়গায়। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়াবে, এমন প্রত্যাশা থাকলেও সেটি হয়নি। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো এবং মর্যাদার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমলাদের সঙ্গে এটি মেলানো যাবে না।
সংলাপে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতি ঢুকিয়ে পুরো জাতিকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, সংস্কার সংস্কার করে চারদিকে মাতিয়ে রাখা হয়েছে। এ জন্য বিদেশ থেকে লোকজন আমদানি করা হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যে অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা বিরাজ করছে, তা নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। তিনি বলেন, দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো নেই। এটি নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্য খাতে চাপ কমবে। সেই সঙ্গে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন- সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক শওকত আরা হোসেন, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান সরদার এ নাঈম, জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের অংশের) মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বিএনপির ‘থিঙ্কট্যাংক’ জি-নাইন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত প্রমুখ। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
মন্তব্য করুন