সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেই আমেরিকার জন্য হয়ে উঠেছিলেন নিরাপত্তা হুমকি। তেমনি ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহুর নীতিগুলো ইসরায়েলের গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঝুঁকিপূর্ণ করছে এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আরেকটি সহিংস বিদ্রোহ- তৃতীয় ইন্তিফাদাকেও উসকে দিচ্ছে বলে মনে হয়৷ ট্রাম্পের মতো, নেতানিয়াহুও ক্ষমতা ধরে রাখা ছাড়া আর কিছুই চিন্তা করেন না এবং তার র্যাডিকাল নীতিগুলোর মূল লক্ষ্য, অতি-ডানপন্থি চরমপন্থি দলগুলোর জোটকে একত্রে রাখা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন, ইসরায়েলের একজন সত্যিকারের বন্ধু। নেতানিয়াহু যে ধ্বংসাত্মক পথে চলেছেন তা থেকে তিনি সতর্ক করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। গত সপ্তাহে জো বাইডেন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিল, এমনকি ডিসেম্বরে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বসার পর প্রথমবারের মতো তাকে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জো বাইডেন এ সময় নেতানিয়াহুর বর্তমান মন্ত্রিসভাকে তার দেখা ইসরায়েলের সবচেয়ে চরমপন্থি মন্ত্রিসভাগুলোর মধ্যে একটি বলে অভিহিত করেছিলেন।
নেতানিয়াহুকে দেওয়া বাইডেনের সাক্ষাতের প্রস্তাব ছিল একটি সমঝোতামূলক অঙ্গভঙ্গি যা ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোকে হতাশ করেছিল।
কিন্তু বাইডেন-নেতানিয়াহু কথোপকথনে উভয়পক্ষের মধ্যে অব্যাহত বিরোধ স্পষ্ট ছিল। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য ‘আরও একতরফা পদক্ষেপ’ না নেওয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন জো বাইডেন। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েলের বিচার বিভাগের সংস্কার এবং ‘বিস্তৃত সম্ভাব্য ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার’ ওপর জোর দিয়েছিলেন। বিপরীতে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা নেতানিয়াহুর প্রিয় বিষয়গুলো প্রচার করেছেন, যেমন, ইরান বিরুদ্ধ প্রচারণা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
দুর্ভাগ্যবশত, বাইডেনের ইতিবাচক প্রভাব চাপা পড়ে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর উগ্র রিপাবলিকান সমর্থকদের হাঙ্গামায়। তারা হাস্যকরভাবে বাইডেনকে ইসরায়েলবিরোধী বলে অভিযুক্ত করছে। রিপাবলিকানরা ইসরায়েলি গণতন্ত্রের ওপর নেতানিয়াহুর আক্রমণকে সক্ষম করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে যেমন ছিল মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর ট্রাম্পের আক্রমণ।
নেতানিয়াহু ভালোভাবেই জানেন, তিনি যাই করেন না কেন তার উগ্র সমর্থকদের সমর্থন পাবেন। ইসরায়েলের জন্য তিনি যত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেন না কেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা না শুনলেও তার চলবে।
ইসরায়েলি নাগরিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ কার্যত ইসরায়েলকে স্থবির করে দেওয়ার পর গত বসন্তে নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগীয় সংস্কার বিল স্থগিত করেছিল পার্লামেন্ট। এই বিচার বিভাগীয় সংস্কার বিল পাস হলে ইসরায়েলি সামরিক সংরক্ষকদের অনেকেই পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তারপরও সোমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট প্রথম ধাপে আইনটি পাস করে। ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো অবিলম্বে সরকারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইসরায়েল এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অত্যাচারের ওপর তার কয়েকটি চেকের মধ্যে একটি হারাতে দাঁড়িয়েছে। আর সেই চেকটি হলো ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট।
নেতানিয়াহু এবং তার সমর্থকরা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ক্ষুব্ধ। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে অতি-অর্থোডক্সদের জন্য সরকারের ব্যাপক ছাড় উদ্যোগ বাতিল করেছে, অবৈধ পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে সীমিত করেছে এবং নেতানিয়াহুকে তার মন্ত্রিসভায় একটি অতি-অর্থোডক্স দলের নেতাকে নিয়োগ করতে বাধা দিয়েছে। এ ছাড়া আদালত নেতানিয়াহুকে কর ফাঁকি ও প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
নেতানিয়াহু এবং তার অতি-ডানপন্থি মন্ত্রিসভা তাদের নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অতি সামান্য থাকা সত্ত্বেও খুব দ্রুত তাদের অতি-জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা কার্যকর করার জন্য একটি সুযোগ পেতে পারে।
নেতানিয়াহু এবং তার সহযোগীরা ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে চায়। ৫ লাখ থেকে এই সংখ্যাকে তারা ১০ লাখ করতে চায়। অর্থাৎ আবারও বহু ফিলিস্তিনির বসতি, জমিন এবং তাদের বাড়ি দখল করে সেগুলোতে ইহুদি বসতি তৈরি করবে নেতানিয়াহু। এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
নেতানিয়াহু এবং তার উগ্রনীতি, যা শুধু ইসরায়েলি গণতন্ত্রের জন্য নয় বরং ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকিতে পরিণতি হবে।
ম্যাক্স বুট (Max Boot), আমেরিকান লেখক ও সামরিক ইতিহাসবিদ
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর - মুজাহিদুল ইসলাম
মন্তব্য করুন