

সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। দেশে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি এগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতেও নানা উদ্যোগ নেন খালেদা জিয়া। এ জন্য উদ্যোক্তাবান্ধব নানা নীতি প্রণয়ন করেন। সরকারের রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট আইনও হয়েছে তার প্রথম শাসনামলে। নারীশিক্ষায় তার নেওয়া উদ্যোগ শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে এ কথাগুলো বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, বেগম জিয়ার শাসনামলে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বাড়াতে বিভিন্ন নীতি নেওয়া হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে মজবুত করে।
রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে এই স্মৃতিচারণা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশসহ দেশের ১৮টি বাণিজ্য সংগঠন। এতে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, করপোরেট ব্যক্তিত্ব, অর্থনীতিবিদ, কূটনৈতিক ও রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে স্মৃতিচারণা ও দোয়া মাহফিল শুরু হয়। তারপর খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন হলভর্তি অতিথিরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ব্যবসায়ীদের স্মৃতিচারণা
শুরুতে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ের দশক ও ২০০০ সালের শুরুর দিকে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া প্রায়ই বলতেন, বাংলাদেশ ছাড়া তার কোনো ঘর নেই। তার সেই দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরাও ব্যবসায়িক মহল থেকে পুনর্ব্যক্ত করছি, আমাদের আস্থা ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকার বাংলাদেশকেন্দ্রিক থাকবে।’
ওষুধশিল্পের উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘ওষুধ খাত উদারীকরণে ১৯৯৪ সালে সাহসী ভূমিকা নেন বেগম জিয়া। আজকে ওষুধশিল্পে যা কিছু উন্নতি দেখা যাচ্ছে, সে জন্য আমরা তার কাছে ঋণী।’
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধারাবাহিক রাখার পথে অগ্রসর হয়। তার শাসনামলে দেশের অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে।
বেগম জিয়ার ব্যবহার নিয়ে স্মৃতিচারণা করে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির সভাপতি আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী কথা বলতেন কম। শুনতেন বেশি। এই গুণ খুব কম মানুষেরই থাকে; সবাই বলতে চায় বেশি। সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, উনি কখনো কারও সম্পর্কে কটূক্তি করতেন না। অন্যায়ভাবে কারাভোগের পরও কটু কথা বলেননি। উনি শুধু বলেছেন, আল্লাহ বিচার করবে।’
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেগম জিয়া অর্থনীতিকে সচল করতে মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করেন। এ ছাড়া ভ্যাট আইন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, বেসরকারীকরণ বোর্ড এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের মাধ্যমে রাজস্ব, আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান ছাড়াও ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে বক্তব্য দেন সিমেন্ট উৎপাদক সমিতির সভাপতি আমিরুল হক, বিজিএমইএর সহসভাপতি ইনামুল হক খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ইনস্যুরেন্স সমিতির সহসভাপতি কাজী সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতির সভাপতি এম এ জব্বার প্রমুখ।
বিএনপি নেতারা যা বললেন
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন উল্লেখ করে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই একটি জাতিকে তিনি (খালেদা জিয়া) সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আমরা আশা করি তার এই চলে যাওয়া আমাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করবে এবং আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের একটা নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব।’
বাংলাদেশ নিয়ে ‘অনেক চক্রান্ত আছে, অনেক ষড়যন্ত্র আছে’ উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশকে আবার পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার অনেক রকম চক্রান্ত আছে। তবে সেখান থেকে আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে।’ সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যে মামলাটায় তিনি (বেগম জিয়া) কারাগারে গেলেন, সে মামলাটা কোনো মামলাই নয়। অথচ সেই মামলায় তাকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।’ এ মামলায় নিম্ন আদালতের পাঁচ বছরের সাজা উচ্চ আদালতে গিয়ে ১০ বছর হওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘হায়ার জুডিশিয়ারিরও (উচ্চ আদালত) কী অবস্থা...সবাই যেন তুষ্ট করতে পারলেই খুশি হয়।’
বেগম খালেদা জিয়া ব্যবসাবান্ধব ছিলেন উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় করতে পেরেছিলেন। তিনি মানুষের কথা বেশি শুনতেন। তবে সিদ্ধান্ত নিতেন কঠিন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মতো বাংলাদেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করতে দেননি বেগম জিয়া। মৃত্যুর আট-নয় বছর আগে তিনি ৩১ দফা সংস্কারের কথা বলেছেন। তার মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারও রয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলধারা হিসেবে ব্যক্তি খাতকে প্রাধান্য দিতেন উল্লেখ করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি এই ধারা ধরে রেখেছে, সামনেও রাখবে। বিএনপির সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। খালেদা জিয়া সংস্কারের যে ধারা দিয়েছেন, তা বিএনপি আগামী দিনেও অব্যাহত রাখবে।’
দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন ও জসিম উদ্দীন, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, পারটেক্স স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন প্রমুখ।
মন্তব্য করুন