

গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে দেওয়া হুমকি উত্তর আটলান্টিক জোটের (ন্যাটো) ভবিষ্যৎ ও ঐক্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়া কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে এসব বিষয়ে নানা প্রশ্ন তুলে আনা হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা পিটুফিক স্পেস বেস অবস্থিত, যা ডেনিশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ায় এই হুমকি জোটের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও কানাডার নেতারা ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হুমকি বাস্তবায়নের পথে আগালে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ন্যাটোর ভিত্তি ও আর্টিকেল ৫-এর সীমাবদ্ধতা
ন্যাটোর মূল ভিত্তি হলো সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। উত্তর আটলান্টিক চুক্তির আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধারা কার্যকর করতে হলে সব সদস্যের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ফলে কোনো ন্যাটো সদস্য যদি আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে ন্যাটো কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যায়। কারণ জোট নিজের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না।
ন্যাটোর ইতিহাসে মাত্র একবার ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ করা হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তবে তা আর্টিকেল-৫ এর কার্যকারিতা ও ন্যাটোর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের নজির কড যুদ্ধ (১৯৫৮–১৯৭৬) : যুক্তরাজ্য বনাম আইসল্যান্ড
উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে মাছ ধরার অধিকার নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আইসল্যান্ডের মধ্যে প্রায় দুই দশক ধরে বিরোধ চলে। একাধিকবার নৌযানের ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইসল্যান্ডের দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়।
সাইপ্রাস সংকট (১৯৭৪) : গ্রিস ও তুরস্ক
গ্রিস সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর তুরস্ক সাইপ্রাসে সামরিক অভিযান চালায়। এতে দুই ন্যাটো সদস্যের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে গ্রিস কয়েক বছর ন্যাটোর সামরিক কাঠামো থেকে সরে দাঁড়ায়।
টারবট যুদ্ধ (১৯৯৫) : কানাডা ও স্পেন
মাছ ধরার অধিকার নিয়ে কানাডা ও স্পেনের মধ্যে নৌ-সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কানাডা স্প্যানিশ ট্রলার আটক করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সংকটের অবসান ঘটে।
যুদ্ধ প্রশ্নে ন্যাটোর গভীর বিভক্তি
সুয়েজ সংকট (১৯৫৬) : সুয়েজ সংকট ছিল ন্যাটোর ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ধাক্কা। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করার পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গে জোটবেঁধে মিসরে সামরিক অভিযান চালায়। তবে এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষুব্ধ হন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার। তার আশঙ্কা ছিল, এই যুদ্ধ আরব বিশ্বকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দেবে এবং ঠান্ডা যুদ্ধের ভারসাম্য নষ্ট করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৬০-১৯৭০ এর দশক) : ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা ও সেনা পাঠানোর আহ্বান জানায়। তবে ফ্রান্স ও ব্রিটেন এই যুদ্ধকে কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচনা করে সরাসরি অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ফ্রান্স ১৯৬৬ সালে ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক কমান্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জোটের কাঠামোয়— ন্যাটোর সদর দপ্তর প্যারিস থেকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে স্থানান্তর করা হয়।
ইরাক যুদ্ধ (২০০৩) : ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবির ভিত্তিতে যখন ইরাক আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়, তখন ন্যাটো গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিলেও ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়াম এর তীব্র বিরোধিতা করে। এই বিভাজন এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে, ওয়াশিংটনের অনেক নীতিনির্ধারক একে ‘পুরোনো ইউরোপ’ ও ‘নতুন ইউরোপ’-এর দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান ন্যাটোর আওতায় না এসে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর যুদ্ধ হিসেবে পরিচালিত হয়।
লিবিয়া অভিযান (২০১১) : লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক জনগণকে রক্ষার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ যখন ‘নো-ফ্লাই জোন’ কার্যকরের অনুমোদন দেয়, তখন ন্যাটোর অভ্যন্তরে আবারও মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিযানের নেতৃত্ব, পরিধি ও লক্ষ্য নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, যার ফলে সামরিক অভিযানে ন্যাটোর ভূমিকা নির্ধারণে বিলম্ব ঘটে।
গ্রিনল্যান্ড সংকট : ন্যাটোর ভবিষ্যৎ পরীক্ষার মুহূর্ত
আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ন্যাটোর মধ্যে মতভেদ থাকলেও জোট এখনো টিকে আছে।
মন্তব্য করুন