

গাজা যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে নাও চাইতে পারেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ জন্য চারটি কারণ তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আলজাজিরার প্রতিবেদনে এসব কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন এবং মনে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি কাঙ্ক্ষিত সমর্থন পেয়েছেন। সোমবার তাদের বৈঠকের পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘নায়ক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, গাজা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইসরায়েল শতভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।
তবে এর মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতি দেখাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ভবিষ্যতে সুবিধাজনক সময়ে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর পথ খোলা রাখতে চাইছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, গাজায় আটক সব বন্দির (জীবিত ও মৃত) বিনিময়, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং সামরিক অবস্থান স্থগিতের পর দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা। এই ধাপে গাজা শাসনের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় সব সহায়তা গাজায় ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েল। নেতানিয়াহু দাবি করছেন, শেষ বন্দির মরদেহ ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া যাবে না। পাশাপাশি তিনি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন—যা ট্রাম্পও সমর্থন করেছেন। হামাস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, অস্ত্রের বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা।
তাহলে কি নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ এড়িয়ে যেতে চাইছেন? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে চারটি প্রধান কারণ থাকতে পারে।
ডানপন্থিদের চাপ
নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি। যুদ্ধকালীন এই কট্টরপন্থিদের সমর্থন তার রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করছেন এবং গাজা দখলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও যুদ্ধবিরতি মানতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি সম্প্রতি পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে বসতি গড়ার পথ তৈরি করবে—যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে বক্তব্য প্রত্যাহার করেন।
গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী চান না
গাজায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন হলে ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতা সীমিত হবে। এতে ভবিষ্যতে গাজায় পুনরায় প্রবেশ, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা বা হামাসের অবশিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কঠিন হবে।
যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৪০০–এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাহিনী এলে যুদ্ধকে ইসরায়েলের ‘ঘরোয়া সংঘাত’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ কমে যাবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাইরের শক্তির প্রভাব বাড়বে। একজন ইসরায়েলি বিশ্লেষকের ভাষায়, বিদেশি বাহিনী ঢুকলে নেতানিয়াহুর কার্যকর স্বাধীনতা অনেকটাই হারিয়ে যাবে।
দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অগ্রগতি ঠেকানো
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সরাসরি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা না থাকলেও ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রাজনৈতিক দিগন্ত’ তৈরির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধী।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতিকে ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যা বাস্তবসম্মত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে তুলবে। স্মোটরিচ নিজেই বলেছেন, এসব প্রকল্প ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দেবে’।
নতুন যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে লাভজনক
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে, পাশাপাশি অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সেনাসেবার প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে তার ব্যর্থতা নিয়েও জনরোষ বাড়ছে—সবই একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বছরের প্রাক্কালে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এসব ইস্যু আড়ালে চলে যেতে পারে। গাজা, লেবাননে হিজবুল্লাহ বা এমনকি ইরানের সঙ্গে সংঘাত তাকে আবার ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেবে এবং জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাতে সমালোচনা দমন করা সহজ হবে।
মন্তব্য করুন