ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের তিন দিনের মাথায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ১৩ জন উপদেষ্টা গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান। উদ্দীপ্ত তারুণ্যের সেই শক্তিকে ধারণ করে গঠিত হলো নতুন সরকার। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণে দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবযাত্রার সূচনা করবে বলে আশা দেশের মানুষের।
তিন দিনের শূন্যতা কাটিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্য উপদেষ্টারা হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুর্শিদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক নায়েবে আমির আ ফ ম খালিদ হাসান, মানবাধিকার কর্মী এবং গবেষক ফরিদা আখতার, গ্রামীণ শিক্ষার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম দুজন ছাত্র প্রতিনিধি সরকারে স্থান পেয়েছেন। এ ছাড়া বিধান রঞ্জন রায়, ফারুক-ই আজম বীরপ্রতীক ও সুপ্রদীপ চাকমাকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হলেও ঢাকার বাইরে থাকায় তারা শপথ নিতে পারেননি।
তাদের মধ্যে বিধান রঞ্জন রায় সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমি শপথ নিতে যাইনি। আমি এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আমি আমার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত জানাব। এখন এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।’
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী, বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধিসহ ১ হাজার ২০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কাউকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দীন সরকার, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, সিনিয়র নেতা ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, মীর সরফত আলী সপু উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব পার্থ, কৃষক, শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, গণতন্ত্র মঞ্চের আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, সাইফুল হক, শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, এলডিপির অলি আহমদ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, খন্দকার লুৎফর রহমান, গোলাম মওলা চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ১২ দলীয় জোটের লায়ন ফারুক রহমান, গণঅধিকার পরিষদের কর্নেল (অব.) মসিউজ্জামান, ফারুক রহমান, বিপিপির বাবুল সরদার চাখারী শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সিপিবি সভাপতি মো. শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, রাজেকুজ্জামান রতন ও খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ জাসদের শরীফ নুরুল আম্বিয়া, নাজমুল হক প্রধান ও ডা. মোশতাক হোসেন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের ইকবাল কবির জাহিদ ও অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির মোশরেফা মিশু ও শহিদুল ইসলাম সবুজ, বাসদ মার্কসবাদীর মাসুদ রানা ও সীমা দত্ত শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের মধ্যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, সাংবাদিক নেতা কাদের গণি চৌধুরী, রাশেদুল হকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ১ হাজার ২০০ অতিথি শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গতকাল রাত সাড়ে ৭টার পরে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বনানীর বাসভবন থেকে সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন। রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে তিনি বঙ্গভবনে পৌঁছান। এ সময় ৮৪ বছর বয়সী অধ্যাপক ইউনূসের পরনে ছিল চিরাচরিত গ্রামীণ চেকের ফতুয়া ও ক্রিম কালারের কটি। রাত ৯টায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।
৯টা ২০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথবাক্য পাঠ করান। প্রধান উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করানোর পর পৃথকভাবে ১৩ উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি।
তিনজন শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শপথ অনুষ্ঠানে জানান, ডা. বিধান রঞ্জন রায়, ফারুক-ই আজম বীরপ্রতীক ও সুপ্রদীপ চাকমা বর্তমানে ঢাকার বাইরে থাকায় শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
প্যারিস অলিম্পিকের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন ড. ইউনূস। এর মধ্যে ছাত্র-জনতার বিপুল গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের সরকারের পতন ঘটে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচনের প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীও তাতে সমর্থন দেয়। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের সঙ্গে একমত হন।
শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিতে বুধবার প্যারিস থেকে দেশের পথে রওনা হন ইউনূস। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকায় নামেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ও নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, নতুন আইজিপি ময়নুল ইসলাম এবং র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অধ্যাপক ইউনূসকে অভ্যর্থনা জানান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহসহ কয়েকজনও উপস্থিত ছিলেন। মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তারা তুলে দেন ফুলের তোড়া। সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, উবিনিগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন বিমানবন্দরে।
আহতদের দেখতে হাসপাতালে ড. ইউনূস: শপথ গ্রহণ শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ঢামেক হাসপাতালে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, ঢামেক হাসপাতাল পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তারা।