প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া আবু সাঈদকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টের পর সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের এক নবীন কর্মকর্তা। আদালতে মামলার পর তার বিরুদ্ধে সমনও জারি করেছেন বিচারক। আরেকজন কর্মচারী প্রফেসর ড. ইউনূসের ‘ফাঁসি’ নিশ্চিত বলে মন্তব্য করেন। সরকারি কর্মচারীদের এমন আচরণকে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। এমন আচরণ চলতে থাকলে দেশব্যাপী নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা। এজন্য আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী কর্মচারীদের স্থায়ী বরখাস্তসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ এসেছে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে।
বাংলাদেশ লোক প্রশাসন কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর (সচিব) এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার কালবেলাকে বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি কর্মচারীদের অনুগত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটি না থাকলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রাষ্ট্র ও সরকার হুমকির মুখে পড়ে। কর্মচারীরা যেন সরকারের প্রতি অনুগত থাকে সেজন্য সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালাও করা হয়েছে। সুতরাং এই আচরণবিধি মেনেই তাদের চাকরি করতে হবে। এখানে সরকারের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে মন্তব্য করা গুরুতর অপরাধ। যারা এ ধরনের অপরাধ করবেন তারা চাকরিতে থাকার যোগ্যতা হারাবেন। অর্থাৎ তাদের গুরুদণ্ড হিসেবে স্থায়ীভাবেই চাকরিচ্যুত করতে হবে। না হলে প্রশাসনে নৈরাজ্য দেখা দেবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক এই সচিব রাষ্ট্রের কর্মচারীদের অনুগত থাকা না থাকা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি উদাহরণও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তান যুদ্ধে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশ অমান্য করার দায়ে ত্রাতাউস নামে একজন লে. জেনারেলের চাকরি চলে গিয়েছিল। পুরো সেনাবাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখার জন্য ওবামা প্রশাসন ওই সেনা কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন।
তিনি আরও জানান, ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমেনের নির্দেশ অমান্য করে বারবার চীন আক্রমণের পদক্ষেপ নেওয়ায় সেনা কমান্ডার ম্যাকার্থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আব্দুল আউয়াল বলেন, উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই তার কর্মচারীদের সরকারের প্রতি অনুগত থাকার বাধ্যবাধকতা রেখেছে। এর ফলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা থাকে। তবে কেউ যদি সরকারের সমালোচনা করতেই চান, তাহলে তিনি যেন চাকরি ছেড়ে দেন।
গত শনিবার লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপসী তাবাসসুম উর্মি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আক্রমণাত্মক পোস্ট দেন। আরেকটি পোস্টে তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী পোস্টের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়ে শাহাদাতবরণকারী আবু সাঈদসহ অন্য শহীদদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের অভিযোগে উর্মির বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মানহানির মামলার আবেদন করেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। আদালত মামলা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে আগামী ২৮ নভেম্বর তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির হতে সমন জারি করেছেন বিচারক।
অন্যদিকে উর্মির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তার মা নাসরিন জাহান। তিনি বলেন, তাপসী তাবাসসুম উর্মি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এটি তার ঠিক হয়নি। এটি একটি বড় অপরাধ। মা নাসরিন জাহান বলেন, আমরা যুদ্ধ করিনি, যুদ্ধ দেখিনি। যে যুদ্ধ হয়েছে, সেটা ইতিহাস। তবে ইতিহাসকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা আমাদের মা-বাবাকে অস্বীকার করতে পারব কি? তিনি আরও বলেন, উর্মি ছাত্রজীবনে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। তবে ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল। তখন তার ৪০তম বিসিএস পরীক্ষা ছিল। সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে। সেখান থেকে মাস্টার্স করেছে। আমার সন্তানরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই।
জানা গেছে, তাপসী তাবাসসুম উর্মি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের নসিবপুর গ্রামের মো. ইসমাইল হোসেনের মেয়ে। বাবা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ। উর্মির মা নাসরিন জাহান মুক্তাগাছার হাজী কাশেম আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য করে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানে গোপনীয় সহকারী (সিএ) এসএম মনিরুজ্জামান। তিনি ঝালকাঠি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক।
দেশের মূলধারার সংবাদপত্র দৈনিক প্রথম আলোতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি সাক্ষাৎকার দেন। ‘জেলে না গিয়ে বঙ্গভবনে শপথ নিলাম’ এই শিরোনামে ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সংবাদটি দৈনিকটির ফেসবুক পেজে শেয়ার করলে সিএ মনিরুজ্জামান কটূক্তি করে মন্তব্যের ঘরে লেখেন, ‘আগে জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, এখন ফাঁসি নিশ্চিত (যদি বাংলাদেশে জীবিত থাকেন)।’ বিষয়টি জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমানের নজরে এলে তিনি সিএ মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। এরপর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই সমাধান দেখছেন না প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এমন ধৃষ্টতা দেখানো কর্মচারীদের চাকরিতে বহাল রাখা হলে অন্যরাও দুঃসাহস দেখাবে। সুতরাং এদের স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া কালবেলাকে বলেন, কর্মচারীদের এমন আচরণ স্পষ্টই অসদাচরণ। এটার জন্য অবশ্যই গুরুদণ্ড দিতে হবে। গুরুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুতি। তবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সেটা হতে হবে। তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। কেন তারা এমন পোস্ট দিচ্ছেন? রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট হলে এটা গুরুতর অসদাচরণ হিসেবেই দেখতে হবে। কারণ কর্মচারীরা চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কোনো কার্যক্রম চালাতে পারেন না। এজন্য এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অন্য কর্মচারীদের বার্তা দিতে হবে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ফেসবুকে কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না সে বিষয়ে সরকার একটি নির্দেশনা জারি করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই নির্দেশনার একটি অংশে বলা হয়, জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থি কোনো কনটেন্ট প্রকাশ করা যাবে না। প্রকাশ করা যাবে না কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এরকম কোনো কনটেন্টও। জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এ ধরনের মন্তব্য করার ব্যাপারেও সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিষেধ করে দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৫ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আরও একটি নির্দেশনা দেয়। সেখানে বলা হয়, ফেসবুকে ভিত্তিহীন, অসত্য ও অশ্লীল তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য সংবলিত পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক ও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে—(১) সরকারি কর্মচারী নিজ নামে প্রকাশিত কোনো লেখায় অথবা তাহার কর্তৃক জনসম্মুখে প্রদত্ত বক্তব্যে অথবা বেতার বা টেলিভিশন সম্প্রচারে কোনো বক্তব্যে এমন কোনো বিবৃতি বা মতামত প্রকাশ করিতে পারিবেন না, যাহা সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলিতে সক্ষম।
অথচ কর্মচারীরা এমন বিধি উপেক্ষা করেই চলেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জারি হওয়া নির্দেশনাও অমান্য করে তাদের সমর্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্বর্তী সরকারে বিরুদ্ধে এবং জুলাই গণহত্যার পক্ষে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রশাসন নিয়ে কাজ করা বিশিষ্টজন।