

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষে প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩০০টি নির্বাচনী এলাকায় দাখিল করা মনোনয়নপত্রের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে ৭২৩ জনের মনোনয়ন। গতকাল রোববার শেষ দিনে জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, জামায়াতের দুই প্রার্থীসহ অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
ইসি জানায়, এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র গ্রহণের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪০৬টি, যার বিপরীতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী। যাচাই-বাছাই শেষে অঞ্চল বা বিভাগ অনুযায়ী বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা হচ্ছে—ঢাকা অঞ্চলে ৩০৯ জন, যেখানে বাতিল হয়েছে ১৩৩টি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৩৮, বাতিল হয়েছে ৫৬টি। রাজশাহী অঞ্চলে ১৮৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, বাতিল হয়েছে ৭৪টি।
এ ছাড়া খুলনা অঞ্চলে ১৯৬ জন প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন, অবৈধ হয়েছেন ৭৯ জন। বরিশাল অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৩১, বাতিল হয়েছে ৩১ জনের মনোনয়ন। সিলেট অঞ্চলে ১১০ জন প্রার্থীর আবেদন বৈধ হয়েছে, বাতিল হয়েছে ৩৬ জনের। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১৯৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ পাওয়া গেছে, বাতিল হয়েছে ১১২ জনের। কুমিল্লা অঞ্চলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ২৫৯, বাতিল হয়েছে ৯৭ জনের। রংপুর অঞ্চলে বৈধ প্রার্থী ২১৯ জন, বাতিল হয়েছে ৫৯টি। ফরিদপুর অঞ্চলে ৯৬ জন প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন, বাতিল হয়েছে ৪৬টি।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় মোট ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ এবং ফেনী-১ আসনের ৩টি মনোনয়নপত্র কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয়েছে। প্রকাশিত এই ফলের ওপর কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকলে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইসিতে আপিল করতে পারবেন।
শেষ দিনে মনোনয়নপত্র বাতিল হলো যাদের: যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। মনোনয়ন বাতিল ঘোষণার পর প্রতিবাদে সম্মেলন কক্ষের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী অভিযোগ করেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনোনয়নপত্রটি বাতিল করেছেন। আমাদের কোনো কথা শোনেননি; আমার কোনো কাগজপত্র দেখতেও চাননি। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।’
অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘নির্বাচনী নীতিমালা ও আইনের মধ্যে থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব কিংবা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই। সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল করতে পারবে।’
দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন বলেন জানান। গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। তবে গতকাল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়, হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করা হলেও তার পক্ষে কোনো নথিপত্র দেওয়া হয়নি।
জামায়াতের প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক বলেন, তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন। সোমবার (আজ) এ বিষয়ে শুনানি হবে। তাই তার প্রার্থিতা বহাল রাখার আবেদন জানান তিনি।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন দলের দক্ষিণ জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস। তবে মনোনয়নপত্রে নিজেই হয়েছেন নিজের প্রস্তাবকারী। ফলে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব (বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পক্ষের জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান) মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু ও আবু বকর সিদ্দীক।
যাছাই-বাছাইয়ে সিদ্দীক টিকে যান। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লার মনোনয়নও বাতিল করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু, সাবেক সহসভাপতি রুহুল হোসাইন এবং সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ শতাংশ ভোটারের তালিকায় গরমিলের কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমাদানের সাপেক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুজ্জামান খোকনের মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। এ আসনে গণঅধিকার পরিষদের শফিকুল ইসলামসহ চারজনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
বরিশালে ছয়টি আসনে স্থগিত ১০ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে। পাশাপাশি বাতিল হওয়া ছয়জনের মধ্যে দুজন রিভিউ করে তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। স্থগিত থেকে বৈধতা পাওয়া ১০ প্রার্থী হলেন বরিশাল-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. কামরুল ইসলাম খান এবং বরিশাল-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মান্নান, তৃণমূল বিএনপির মো. সাহেব আলী, জাতীয় পার্টির এম এ জলিল এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আব্দুল হক।
বরিশাল-৩ আসনে জাপার তিন নেতার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক সংক্রান্ত জটিলতায় অনেক স্থানে প্রার্থীদের অবৈধ ঘোষণার মধ্যে তিনজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়। তারা হলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ইকবাল হোসেন তাপস এবং জাপার একটি অংশের জোট এনডিএফের ফকরুল আহসান শাহজাদা। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুস সাত্তার খানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া পাঁচজন নারী প্রার্থীর মধ্যে তিনজন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছেন। যাচাই-বাছাই শেষে দুজন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তারা হলেন চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাকিলা ফারজানা এবং চট্টগ্রাম-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আক্তার।
আয়করের কপি দাখিল না করায় ফেনী-১ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ নাজমুল আলম,
ফেনী-২ আসনে হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া ও ফেনী-৩ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ আলী মিল্লাতের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
পাবনা-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ভোটার সমর্থক ফরমে ত্রুটি এবং মামলার তথ্যে গরমিল থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়।
আয়কর রিটার্ন না থাকায় জামালপুর জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ব্যবসায়ী জাকির হোসেন খানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নুরুজ্জামান ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলরে গিয়াস উদ্দিনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। কুষ্টিয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আল আহসানুল হক, কুষ্টিয়া-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাদী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল আনসারের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
মানিকগঞ্জ-২ আসনে সাবেক এমপি জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী এস এম আব্দুল মান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী সিংগাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবিদুর রহমান নোমান, জেলা বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আব্দুল হক মোল্লার মনোনয়ন বাতিল হয়।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আতাউর রহমান আতা, এবি পার্টির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতা ফারুক হোসেনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
দলীয় মনোনয়নের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায় সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী মো. আব্দুল হাকিম ও সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে দলটির প্রার্থী মতিয়ার রহমানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ায় শফিকুল ইসলাম ছালামের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
পাবনার পাঁচটি আসনে পাঁচজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে পাবনা-২ আসনে গণফোরামের শেখ নাসির উদ্দিন ও পাবনা-৩ আসনে গণধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম রাজা বাছাই লড়াইয়ে টিকতে পারেননি।
নওগাঁ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য মাহমুদুস সালেহীনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। নওগাঁ-৩ আসনে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক ডেপুটি স্পিকার প্রয়াত আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনির মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। নওগাঁ-৫ আসনে বিএনপি পরিচয় দিলেও সঠিক তথ্য না থাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সমবায়বিষয়ক সম্পাদক নজমুল হক সনির মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
নওগাঁ-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বৈধ হয়েছেন বিএনপির চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। ময়মনসিংহের চারটি আসনে শেষ দিনে ১২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তাদের বেশিরভাগই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
সিলেট-২ আসনে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায় ‘গুম’ হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর ছেলে মো. আবরার ইলিয়াসের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। সিলেট-৪ আসনে দাখিলকৃত কাগজপত্রে গরমিল থাকায় জাপার মো. মুজিবুর রহমানের মনোনয়নপত্র স্থগিত এবং প্রস্তাব ও সমর্থকের তথ্যে গরমিল থাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা সাঈদ আহমদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। সিলেট-৫ আসনে ঋণ খেলাপির কারণে জাপার মো. সাইফুদ্দিন খালেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। সিলেট-৬ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমানের।
মন্তব্য করুন