বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানিতে সমালোচনার মুখে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অনিয়মে জর্জরিত রেস্তোরাঁ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে নেমেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা। অগ্নিঝুঁকি ও অনুমোদনের কাগজপত্র না থাকায় গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীতে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে। এদিকে চলমান অভিযানের ভয়ে রাজধানীতে ধস নেমেছে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়। অভিযানে আতঙ্কিত হয়ে অধিকাংশ মালিক বন্ধ রেখেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তার কারণে কমেছে ক্রেতার আনাগোনাও। হুট করে রেস্তোরাঁ বন্ধ না করে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের চার দিন পর গতকাল ওই এলাকায় বিভিন্ন আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় রাজউক। এ সময় সুলতানস ডাইন, নবাবী ভোজ, রোস্টার ক্যাফে ও পিজ্জা মাস্টান নামে চারটি রেস্টুরেন্ট সিলগালা করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের সনদ না থাকায় সুইস বেকারি ও ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার শপিংমলের মালিককে জরিমানা করা হয়। অভিযানে কোনো রেস্টুরেন্টেই গণমাধ্যমকর্মীদের ঢুকতে দেননি রাজউকের কর্মকর্তারা।
দোতলা একটি ভবনের নিচতলায় নবাবী ভোজ রেস্তোরাঁটি অবস্থিত। অভিযানের খবর পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রেস্তোরাঁ বন্ধ করে পালিয়ে যান। সুলতানস ডাইন রেস্টুরেন্টটিও বন্ধ দেখা যায়। সেখানে একটি নোটিশে লেখা রয়েছে, ‘রেনোভেশন কাজের জন্য সাময়িকভাবে সুলতানস ডাইন বন্ধ রয়েছে’। রেস্টুরেন্ট দুটি সিলগালার সময় মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি।
অভিযান পরিচালনাকারী রাজউকের অঞ্চল-৭-এর পরিচালক মনির হোসেন হাওলাদার বলেন, সুলতানস ডাইনসহ তিনটি রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজপত্র চাওয়া হয়। কিন্তু তারা সরবরাহ করতে না পারায় সিলগালা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সরবরাহ করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যথাযথ অনুমতি না থাকায় নবাবী ভোজ রেস্টুরেন্টটি সিলগালা করা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার শপিংমলের মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় না থাকায় সুইস বেকারিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
রাজধানীর অনিরাপদ ভবন নিয়ে রাজউকের ঘুম কবে ভাঙবে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজউক ঘুমিয়ে নেই। এর আগেও রাজউক নিয়মিত অভিযান চালিয়েছে। হয়তো সেটা গণমাধ্যমের চোখে পড়েনি। শুধু রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে না। যেখানেই সমস্যা বা কোনো ব্যত্যয় পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে গতকাল রাজধানীর রেস্টুরেন্টপাড়া হিসেবে পরিচিত খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস। অভিযানের খবর পেয়ে সকাল থেকেই খিলগাঁওয়ের শহীদ বাকি সড়কের দুই পাশের শতাধিক রেস্তোরাঁ মালিকপক্ষ বন্ধ রাখে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানকার বহুতল একটি ভবনে অভিযান চালানো হয়। ভবনটির নিচতলায় একটি কাপড়ের শোরুম আছে। ভবনের বেজমেন্ট, ছাদসহ বাকি সবকটি তলাতেই রেস্টুরেন্ট রয়েছে। ভবনটিতে শর্মা কিং নামের একটি রেস্তোরাঁ খোলা থাকলেও কর্মীরা পালিয়ে যান। বাকি সবকটি রেস্টুরেন্ট বন্ধ দেখা যায়। পরে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় পুরো ভবন সিলগালা করে দেওয়া হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভবনটি অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর একটি মাত্র সিঁড়ি, যা আগুন লাগলে ব্যবহার করা খুব কঠিন হতো। রেস্টুরেন্টগুলোর রান্নাঘরগুলো খুবই সংকীর্ণ। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ভবনটি রেস্টুরেন্টের জন্য অব্যবহারযোগ্য বলা হয়েছে।
একটি বহুতল ভবনে যাওয়ার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দেখতে পান ভবনটির নিচতলায় ‘রেস্টুরেন্টের উন্নয়ন কাজের জন্য প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ’ এমন একটি ব্যানার ঝুলছে। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ৫৮৯/সি ঠিকানার ভবনটিতে কাচ্চি ভাই, সিরাজ চুইগোস্তসহ পাঁচটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর আলমকে সাংবাদিকরা জানান, রাতে এসব রেস্তোরাঁ খোলা রাখা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হয় দিনের বেলায়। তাদের অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এর পরও অতিগুরুত্বপূর্ণ হলে তারা অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানের খবর পেয়ে এদিন বেইলি রোডের মতো খিলগাঁওয়ের ওই সড়কের বেশিরভাগ রেস্তোরাঁই বন্ধ পাওয়া যায়। চায়না ল্যান্ড, আপন কফি হাউস, চায়ের বাড়ি, সাব লাভার্স, সুলতান, হট কেক, হার্ফি, গোল্ডেন চিকসহ আরও অনেক রেস্তোরাঁয় তালা ঝুলতে দেখো গেছে।
আলফ্রেসকো নামে একটি রেস্তোরাঁ বন্ধ পেয়ে তাদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. হানিফ লেন, খিলগাঁওয়ের রেস্তোরাঁগুলোয় সিটি করপোরেশন অভিযান চালাচ্ছে। এজন্য আমরা বন্ধ রেখেছি। তবে ওই এলাকার সিক্রেট রেসিপি, ভূতের আড্ডাসহ কয়েকটি রেস্তোরাঁ খোলা পাওয়া যায়।
এর আগে গত সোমবার খিলগাঁওয়ের রেস্তোরাঁগুলোয় অভিযান চালান রাজউকের পরিদর্শকরা। এ সময় ৩৬৮/বি খিলগাঁও, স্কাই ভিউ নাজমা টাওয়ারের ৯টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে সটকে পরেন রেস্তোরাঁগুলোর মালিকরা। এ ছাড়া আল-আকসা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ইজা রেস্টুরেন্ট, পপাইজ কফি অ্যান্ড ফাস্টফুড, কোকো ক্যাফে, বিএফসি, হারফি রেস্টুরেন্টসহ আরও কয়েকটিতে অভিযান চালায় রাজউক। এ সময় রেস্তোরাঁ নির্মাণের অনুমতিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিপত্র দেখাতে না পারায় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে মৌখিক নির্দেশনা দেয় রাজউক।
এদিকে মিরপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবের মালিকানাধীন ১১ তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে থাকা সবকয়টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। সংস্থার ঢাকা ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবী বলেন, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও রাজউক যৌথভাবে এই ভবনটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মালিককে জাতীয় গৃহায়নের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মালিক যত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, কোনো অনিয়ম পেলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কাউকে ছাড় দেবে না।
এদিকে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দায় রয়েছে। আমাদের যে পরিমাণ হয়রানি করা হচ্ছে, তা কোনো সভ্য দেশে হতে পারে না। তারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই দুর্নীতিবাজ অফিসাররা কেন এতদিন ঘুমিয়ে ছিল? রেস্তোরাঁ শিল্পকে নিরাপদ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। সরকারের অথরিটিগুলো যাবে, ম্যানেজ হয়ে ফিরে আসবে। অথবা এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, আমরা লাইসেন্সই পাব না। লাইসেন্স না পেলে আমরা আন্ডার টেবিল তাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করব। সেটাই এতদিন হয়ে আসছে। এত বছর ধরে এতগুলো রেস্তোরাঁ চলেছে, প্রশাসন কেন ঘুমিয়ে ছিল? আমরা প্রতিটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরে ৫০০-এর বেশি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু সেগুলোর কোনো রেসপন্স পাইনি। তার মানে, সরকারও উদাসীন ছিল।
ঢাকায় এক দিনে ৪৫৫ রেস্তোরাঁয় পুলিশের অভিযান
রাজধানী ঢাকায় ৫৬২টি প্রতিষ্ঠানে গতকাল মঙ্গলবার অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর মধ্যে রেস্তোরাঁ ছিল ৪৫৫টি, ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে গ্যাস সিলিন্ডার রাখার দোকান ১০৪টি ও তিনটি কেমিক্যাল গুদাম।
ডিএমপি মিডিয়া শাখা থেকে জানানো হয়েছে, ডিএমপির আট বিভাগের পুলিশ সদস্যরা পাঁচটি মামলা করেছে, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ২২৯টিতে। অভিযান চালানো এলাকাগুলোর মধ্যে ১০৩টি মতিঝিলে, ৮৪টি রমনায়, ৭৩টি উত্তরায়, ৬৪টি তেজগাঁওয়ে, ৩৯টি ওয়ারীতে, ৩৫টি লালবাগ, ৩৪টি মিরপুর ও ২৩টি গুলশানে।
ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান পাওয়া গেছে ১০৪টি। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে উত্তরা এলাকায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রমনায়, তেজগাঁওয়ে ১০টি, মিরপুর ও গুলশানে ৭টি করে, মতিঝিলে ৫টি, ওয়ারীতে একটি এবং একটিও পাওয়া যায়টি লালবাগে।
ডিএনসিসির অভিযানে দুই রেস্তোরাঁ সিলগালা
এদিকে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় দুইটি রেস্তোরাঁ সিলগালা করে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এ ছাড়া আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না থাকা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি করায় ৮টি রেস্তোরাঁ থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ডিএনসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ গুলশান, মিরপুর ও উত্তরা এলাকার বেশ কিছু রেস্তোরাঁয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। আগুন ছড়িয়ে যায় পুরো ভবনে। ভয়াবহ এ আগুনে মারা গেছেন ৪৬ জন। এ ঘটনায় ১ মার্চ পুলিশ রমনা থানায় মামলা করে। এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলাটি রমনা থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিকে।