একাত্তরের ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ভাষণ দেবেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের সাক্ষী হতে সারা দেশ থেকে ছুটে এসেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল রেসকোর্স ময়দান। বজ্রকণ্ঠে বঙ্গবন্ধু সেদিন বাংলার মানুষকে মুক্তি সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সামরিক জান্তার নিষেধাজ্ঞার কারণে সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিও-টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হয়নি। তবে শাসকদের রক্তচক্ষু উপক্ষো করে বেতার, ডিএফপি ও ফিল্ম করপোরেশনের আটজন কর্মকর্তার উদ্যোগে ভাষণের অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড করা হয়। এই ভাষণ প্রচারের দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন রেডিও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা। এর ফলে তৎকালীন সরকার পরদিন (৮ মার্চ) রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করতে বাধ্য হয়।
ভাষণ রেকর্ডের দুঃসাহসিক কাজটি যারা করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন পরিচালকসহ তিন কর্মকর্তা, তিনজন সহকারী ক্যামেরাম্যান ও দুজন লাইট বয়। তারা জানতেন, এমন কাজে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাদের হত্যাও করতে পারে। মৃত্যুকে তুচ্ছ করে সেদিন প্রাণপ্রিয় নেতার ঐতিহাসিক ভাষণটি ধরে রেখেছিলেন তারা।
তবে শুধু রেকর্ড বা রেডিওতে প্রচার করেই ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে এই সাহসী বীরদের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা শেষ হয়নি। বৈরী সময়ে সেই রেকর্ড সংরক্ষণ করার জন্যও জীবন বাজি রাখতে হয়েছিল। আর অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেই কাজটি করেছেন মুক্তিযুদ্ধকালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফিল্ম বিভাগের সহকারী ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকার। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ায় পাকিস্তানি শাসকদের রোষানল থেকে বেঁচে যান তিনি। তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভিডিও টেপ রক্ষার কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নানা দুর্ভোগে পড়তে হয় তাকে।
আমজাদ আলী খন্দকারের বয়স এখন ৮১ বছর। সপরিবারে ঢাকার সাভার উপজেলার গেণ্ডা এলাকায় থাকেন তিনি। ৫৩ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করার সেই ঘটনা এখনো অমলিন তার স্মৃতিতে। জানতে চাওয়া হলে কালবেলার কাছে মেলে ধরেন সেই স্মৃতি, ‘পূর্ব পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অধীনে থাকলেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফিল্ম বিভাগের পরিচালক এ কে এম মহিবুবুর রহমানের (নাট্যাভিনেতা আবুল খায়ের) নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটির পুরো অংশ ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল।
আমজাদ আলী বলেন, বঙ্গবন্ধু ভাষণে কী বলবেন—আগে থেকে কিছুই জানা ছিল না। রেকর্ড করা ভাষণটির ফিল্মের আয়তন ছিল ২ হাজার ফুটের বেশি। মঞ্চে বঙ্গবন্ধু যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, তার ডান পাশে সাড়ে তিন ফুট দূরে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। ক্যামেরাম্যানদের দুই দলে ভাগ করে এক দলকে মঞ্চের ভাষণ এবং আরেক দলকে জনসমুদ্র ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মঞ্চের ভিডিও ধারণ করেন সহকারী ক্যামেরাম্যান জেড এম এ মবিন আর আমজাদ আলী খন্দকার। আর ক্যামেরাম্যান এম এ রউফ, সহকারী ক্যামেরাম্যান এসএম তৌহিদ (বাবু) ঘুরে ঘুরে জনসমাবেশের ভিডিও ধারণ করেন। সৈয়দ মাইনুল হাসান টেপরেকর্ডারে অডিও ধারণ করেন। লাইট বয় হাবিব চাকদার আর জুনায়েদ আলী যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ সার্বিক সহায়তা করেছিলেন। লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত স্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের তেজোদীপ্ত ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা। সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সাড়ে তিন ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করতে করতে বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়ের সাক্ষী হয়েছিলেন তারা।
সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১৮ মিনিটের ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইঙ্গিত পেয়েছিলেন মুক্তিকামী জনতা। সেদিন থেকেই পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিহত করার প্রস্তুতি শুরু করেন তারা।
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে। প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়ের (মহিবুবুর রহমান) বুঝে গিয়েছিলেন, সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ভিডিও রেকর্ডটি ধ্বংস করে দেবে। ৯ এপ্রিল তিনি সহকারী ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকারকে ভাষণটি সংরক্ষণের নির্দেশনা দেন।
আমজাদ আলী খন্দকার বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে এলএমজি তাক করেছিল। আবুল খায়ের সাহেবের নির্দেশ মতো ওই দিনই ৪২ ইঞ্চি একটি ট্রাঙ্ক এনে তাতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের টেপরেকর্ড, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্যচিত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্যচিত্র রাখি। ট্রাঙ্ক গুছিয়ে পরিচালকের অনুমতি নিয়ে তেজগাঁও বিজি প্রেসে যাই বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাবাকে বলেছিলাম, অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে দুদিন লাগবে। দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ে ফিরে সমমনা সহকর্মীদের এগিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। তারা বিপদের আঁচ পেয়ে এগিয়ে দিতে রাজি হননি। অন্যদিকে পরিচালক বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছেলেটি যদি ঢাকা থেকে বের হতে না পারে, পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যে দুনিয়া থেকেও চলে যেতে হতে পারে। সেইসঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার দলিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ড হানাদারদের হাতে পড়লে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবে।’
তিনি বলেন, ‘যথাসময়ে একটি বেবিট্যাক্সি ডেকে আমাদের ২২নং শেডের সামনে আনা হয়েছিল। সচিবালয়ের ২নং গেট দিয়ে গাড়ি শুধু ভেতরে ঢুকতে পারত, বের হতে পারত না। সেই গেটের দায়িত্বে ছিলেন সার্জেন্ট ফরিদ। তাকে আগেই আমাদের সংবাদ দেওয়া হয়েছিল। বেবিতে চার-পাঁচজন ট্রাঙ্কটি উঠিয়ে দিয়েছিল। সার্জেন্ট ফরিদ নিজেই মেইন রোডে গাড়ি সিগন্যাল দিয়ে আমাদের বেবিট্র্যাক্সি বের করে দিয়েছিলেন।’
আমজাদ আলী খন্দকার বলেন, ‘সোয়ারিঘাটে চারজন কুলি ট্রাঙ্কটি নৌকায় উঠিয়ে দিয়েছিলেন। নদী পার হয়ে জিঞ্জিরা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসের ছাদে উঠেছিলাম নিরাপত্তার কথা ভেবে। কারণ আমার মনে তখনো ভয় কাজ করছিল। যদি কোনো লোক আমাকে চিনে ফেলে বা পিছু নিয়ে থাকে। এরপর বক্সনগর গিয়ে সেখান থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে জয়পাড়ায় আবুল খায়ের সাহেবের বোনের বাড়ি পৌঁছি। সেখানে ট্রাঙ্কটি লুকিয়ে ফেলি। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এমন সময় পরিচালক সাহেব (আবুল খায়ের) রাস্তা থেকে আমার নাম ধরে আমজাদ, আমজাদ ডাকতে ডাকতে বাড়িতে প্রবেশ করেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন, এত বড় দায়িত্ব পালন করতে পারব কি না।’
স্বাধীনতার পরও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপিরবারে হত্যার পর ভাষণের খোঁজে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে তল্লাশি চালায় খুনি চক্র। আমজাদ আলী খন্দকার তখন ডিএফপিতে কর্মরত। তিনি কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকর্মীকে নিয়ে ভাষণের অডিও-ভিডিও ফুটেজ অন্য ছবির ক্যানে ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখেন। আর ৭ মার্চের ভাষণ লেখা ক্যানে অন্য একটি ছরির নেগেটিভ ভরে রাখেন। ষড়যন্ত্রকারীরা ৭ মার্চের ভাষণ মনে করে সেই ছবির রিল ধ্বংস করে স্বস্তি পায়। আর রক্ষা পায় ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিও রেকর্ড।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিওচিত্রের খোঁজ পড়ে। আমজাদ আলী খন্দকারের কর্মস্থল তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। সরকারের আগ্রহের বিষয়টি জানতে পেরে তারা ভাষণটির সন্ধান দেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বের হয় ইতিহাসের অমূল্য এই দলিল।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংরক্ষণসহ মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য আমজাদ আলী খন্দকারকে ২০২২ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।