বাংলাদেশের বিজয়ের মাস ডিসেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের কথাই ধরা যাক। ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে সেবার প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় প্রধান দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির বিরোধিতার অজুহাত দেখিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন এবং আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। উল্লেখ্য, পিপলস পার্টির নেতা ছিলেন স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর শেখ মুজিবের সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা হতে থাকে। সে সময় তো বটেই, পরবর্তীকালের পর্যালোচনায়ও প্রমাণিত হয়েছে, সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে জেনারেল ইয়াহিয়া খান আসলে গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ। সেটাও এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যার পেছনে ছিল বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর। এ প্রসঙ্গে যে কোনো আলোচনায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর উদ্ভট দাবি ও আবদার সম্পর্কে লিখতেই হবে। কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন নজির সৃষ্টি করে ভুট্টো দুই প্রদেশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছিলেন। সেটাই ছিল সংকটের আশু এবং প্রধান কারণ, যার পরিণতি ছিল পাকিস্তানের ভাঙন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর সম্পর্কে লিখতে হলে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কথাও বলতে হবে। কারণ, আগের মাস নভেম্বরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায় বিপুল ধ্বংসের পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল; কিন্তু ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। এর প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী একদিকে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিলেন, অন্যদিকে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, ৪ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় পবিত্র আল কোরআনের সুরা কাফিরুনের উদ্ধৃতি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন’। যার অর্থ, তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে। এটা ছিল প্রকাশ্যে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা। এরই পাশাপাশি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন বয়কটেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। প্রমাণিত হয়েছে, মওলানা ভাসানী এবং প্রদেশের দ্বিতীয় প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করা সম্ভব হতো না, ঘটনাপ্রবাহও স্বাধীনতা যুদ্ধকে অনিবার্য করত না। সেদিক থেকেও অতুলনীয় হয়ে আছে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর।
পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের একই মাস ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত অন্য এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। পার্থক্য হলো, সেবারের মতো এই নির্বাচনে জনমতের সঠিক প্রতিফল ঘটতে দেওয়া হয়নি। কারণ, এটা ছিল ‘ডিজিটাল’ নির্বাচন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে সংঘটিত লগি-বৈঠার হত্যা ও নৃশংসতা থেকে জরুরি অবস্থা জারি এবং নির্বাচনের নামে নাটক সাজানো পর্যন্ত সবই করা হয়েছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে, যার নাম ছিল ‘রোডম্যাপ’। ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয়েছে, জেনারেল মইন উ এবং ফখরুদ্দিন আহমদদের আসলে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভেতরে ভেতরে তৈরি করা রোডম্যাপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েই বন্দুক হাতে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তারা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ চার দলীয় জোটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নির্বাচনে জিততে এবং ক্ষমতায় যেতে পারবে না বলে হতাশ হয়ে পড়া আওয়ামী লীগও ‘নাচুনে বুড়ির মতো’ ঢোলের বাড়িতে সাড়া দিয়ে নেচে উঠেছিল। এরপর ছিল গোপনে এবং ভারতের মধ্যস্থতায় ‘ডিল’ হওয়ার পালা। সে ‘ডিল’ অনুসারেই ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ‘ডিজিটাল’ নির্বাচন হয়েছিল, ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। কথাটা জানতে জনগণের কয়েকদিনও সময় লাগেনি। বাংলাদেশের জনগণকে ওই ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনের মাশুলও গুনতে হয়েছিল সর্বতোভাবে।
২০০৮ সালের পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরের মাস অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে সারা দেশ তখন উত্তাল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলীয় জোটের ডাকে পালিত অবরোধ দেশকে আক্ষরিক অর্থেই অচল করে ফেলেছিল। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামাঞ্চলেও। প্রতিদিন মৃত্যু ঘটছিল অসংখ্য মানুষের। অনেক জেলায় মনোনয়নপত্র এবং নির্বাচনের কাগজপত্র পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। বহু এলাকায় নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা ছিলেন জনগণের ধাওয়ার মুখে। কিন্তু অমন এক অবস্থার মধ্যেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা একতরফা নির্বাচন করবেন বলে জেদ ধরে বসেছিলেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার নামে নাটকীয়তা করলেও তপশিল বাতিলের জন্য ১৮ দলীয় জোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তারা সরকারের সেবাদাসের ভূমিকাই পালন করবেন। খালেদা জিয়া ওই কমিশনকে কেন ‘অথর্ব’ ও ‘মেরুদণ্ডহীন’ বলেছিলেন তার কারণও তখনই পরিষ্কার হয়েছিল। আসলেও নির্বাচন কমিশন তাল মিলিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে। কিছুদিন পর্যন্ত নিরপেক্ষতা রক্ষার অভিনয় করলেও নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ডিসেম্বরেই সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনাররা নির্লজ্জের মতো খোলস ঝেড়ে ফেলেছিলেন। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সিইসি ও তার সঙ্গী কমিশনাররা আসলে আওয়ামী ঘরানার লোক। ১৮ দলীয় জোটকেও তাই অবরোধের ডাক দিতে হয়েছিল। ফলে অচল হয়ে পড়েছিল সারা দেশ।
ওদিকে সরকার শুরু করেছিল ঢালাও গ্রেপ্তারের ভয়ংকর অভিযান। র্যাব ও পুলিশকে দিয়েও সরকার প্রচণ্ড দমন-নির্যাতন চালিয়েছিল। আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরাও র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল। ডিসেম্বর শুরুর এক দিন আগে, ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর গভীর রাতে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা ও পুলিশের একটি দল রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে ফ্যাসিস্ট অভিযান চালিয়েছিল। চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের কক্ষ থেকে শুরু করে অফিসের কোনো একটি কক্ষ বা স্থানকেই বাদ দেয়নি তারা। সন্ত্রাসীদের মতো ভাঙচুর চালিয়ে কয়েকটি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ এবং বিএনপির গোপনীয় সব ফাইল ও কাগজপত্র বগলদাবা করে নিয়ে গেছে তারা। তাদের হাতে অফিসের কর্মচারীরা তো লাঞ্ছিত হয়েছিলেনই, বাদ পড়েননি এমনকি বেসরকারি কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ও ক্যামেরা পারসনরাও। সাদা পোশাকের লোকজন তাদের যথেচ্ছভাবে পিটিয়েছিল, ভেঙে ফেলেছিল সব ক্যামেরা। যাওয়ার সময় গোয়েন্দা ও পুলিশের দলটি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি আহমদসহ দুজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল।
বিএনপি অফিসে চালানো ওই অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও সেবার প্রচণ্ড প্রতিবাদ উঠেছিল। বিএনপি তখনো সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে থাকায় বলা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের অনুমতি বা অনুমোদন ছাড়া সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ছিল না। অন্যদিকে গোয়েন্দা ও পুলিশকে দিয়ে ভাঙচুর ও লুণ্ঠনের অভিযান চালানো এবং নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেই অভিযোগ উঠেছিল, নির্বাচন কমিশনই অভিযান চালানোর হুকুম দিয়েছে। এর কারণও সিইসি নিজেই তৈরি করেছিলেন। অবরোধ আন্দোলনের মধ্যেও ১ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় একাধিকবার তিনি এমনভাবে ‘বিরোধী দল’ বলেছিলেন, যা শুনে মনে হচ্ছিল যেন শেখ হাসিনা বা তার কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কথা বলছেন! অথচ ‘বিরোধী দল’ নয়, সিইসির চোখে সব দলেরই রাজনৈতিক দল হওয়ার কথা।
সেবারের ডিসেম্বর মাসের অন্য কিছু তথ্যও উল্লেখ করা দরকার। যেমন ১ ডিসেম্বর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু রীতিমতো সিদ্ধান্ত ঘোষণার স্টাইলে বলেছিলেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানায়, তাহলে তপশিল পরিবর্তন করা হবে। অথচ এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার অধিকার কোনো মন্ত্রীর থাকতে পারে না, এটা ছিল সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সিইসি বা তার কোনো সহকর্মীকে টু শব্দটি করতে শোনা যায়নি। এখানেও শেষ নয়। আরেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়, তাহলে দলটির বন্দি সব নেতাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এটাও ছিল আরেকটি সিদ্ধান্তমূলক ঘোষণা। দুটি বিষয়েই নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য ছিল সংবিধান লঙ্ঘন করার দায়ে দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু কাজী রকিব সাহেবরা সংবিধানের ধার ধারেননি! তারা চাকরির আড়ালে সেবাদাসগিরি করেছিলেন বলেই সতর্ক করা বা ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাকুক, টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি। এ অবস্থার সুযোগ নিয়েই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনরা ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও একদলীয় নির্বাচন করতে পেরেছিলেন। তৈরি হয়েছিল ১৫৪ জনের বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিশ্ব রেকর্ড! বলা দরকার, এত কিছুর পরও নির্বাচন কমিশনাররা তাদের সেবাদাসগিরি এবং লেজুড়বৃত্তি থেকে ‘এক চুল’ পর্যন্ত সরে আসেননি।
এখানে ওই একই বছর, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের অন্য একটি ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনার কথা। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, নির্বাচন বাতিলের দাবিতে খালেদা জিয়া ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা ছিল ১৮ দলীয় জোটের কর্মসূচি। কিন্তু সেদিনও খালেদা জিয়ার সঙ্গে যথারীতি চরম দুর্ব্যবহার করেছিল সরকার। এর দুদিন আগে থেকেই পথে ব্যারিকেড দেওয়ার পাশাপাশি তার বাসভবন ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। আগের রাতে বালুবোঝাই পাঁচটি ট্রাক এনে বাসভবনে যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত এসেই থেমে পড়েনি সরকার। খালেদা জিয়ার প্রটোকলের গাড়িও প্রত্যাহার করেছিল। কর্মসূচির দিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর সকাল থেকেই বাসভবনের সামনে কয়েক স্তরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পুলিশ। গেটও তারা এমনভাবেই আটকে রেখেছিল যাতে কারও পক্ষেই বাসভবনে ঢোকা বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব না হয়। উদ্দেশ্যে কোনো রাখঢাকই ছিল না। খালেদা জিয়ার সঙ্গে পুলিশের অসম্মানজনক আচরণ থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তার নয়াপল্টনে যাওয়ার এবং সেখানে অনুষ্ঠেয় সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার একদিকে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে পুরো নয়াপল্টন এলাকাকে মানবশূন্য করে ফেলেছিল, অন্যদিকে খালেদা জিয়াকেও বাইরে আসতে দেয়নি। সমাবেশে অংশ নেওয়ার জন্য দুপুর ১২টার দিকে তিনি গাড়িতে উঠেছিলেন। দীর্ঘ তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত তাকে সে গাড়িতেই বসে থাকতে হয়েছিল। এর মধ্যে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা দফায় দফায় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ খালেদা জিয়াকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। পুলিশের বাধার কারণে সাংবাদিকরাও বেগম জিয়ার কাছে ঘেঁষতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত বিকেলের দিকে পাশের বাড়ির দেয়াল টপকে জনাকয়েক সাংবাদিক বাসভবনের ভেতরে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে কিছু কথা বলতে পেরেছিলেন খালেদা জিয়া। টিভি ক্যামেরার সামনে জনগণের উদ্দেশে তিনি যখন কথা বলছিলেন তখনো বারবার বাধা দিয়েছিল পুলিশ। এ ব্যাপারে বেশি তৎপর দেখা গিয়েছিল বিশেষ একটি জেলার মহিলা পুলিশদের। তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ দুর্ব্যবহারও যথেষ্টই করেছিল।
অন্যদিকে সংযম দেখিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। গাড়ির ভেতরে আটকে রাখার পাশাপাশি পুলিশের ক্রমাগত অসম্মান ও দুর্ব্যবহার করা সত্ত্বেও তিনি গণতন্ত্রসম্মত বলিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সরকারের ফ্যাসিস্ট আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন সিকিমের ‘মির জাফর’ হিসেবে নিন্দিত রাজনীতিক লেন্দুপ দর্জির পরিণতির কথা স্মরণ করতে এবং তার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে। এ প্রসঙ্গেই মানুষের মুখে উঠে এসেছিল লেন্দুপ দর্জির ইতিহাস। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে লেন্দুপ দর্জি ভারতের কাছে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র সিকিমকে তুলে দিয়েছিলেন। এই রাষ্ট্রদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরবর্তীকালে সিকিমবাসী তাকে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান ও বিতাড়িত করেছিল। ভারতের রাজ্যে পরিণত সিকিমের জনগণ তাকে এতটাই ঘৃণা করেছে যে, মৃত্যুর সময়ও লেন্দুপ দর্জি সিকিমে যেতে পারেননি। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও লেন্দুপ দর্জির ভাগ্যই বরণ করতে হবে।
তাকে পুলিশ দিয়ে অবরুদ্ধ করার কঠোর সমালোচনা করে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জানতে চেয়েছিলেন, পিলখানায় দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারদের যখন নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছিল তখন শেখ হাসিনা কেন পুলিশ বাহিনীকে পাঠাননি? কেন তিনি সেনা অফিসারদের বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি? প্রশ্নের জবাবও দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোন দেশের হাত ছিল এবং এ দেশেরও কারা জড়িত ছিলেন সে সম্পর্কে জানানোর পাশাপাশি খালেদা জিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখন চেষ্টা চলছে বাংলাদেশকে সিকিমের মতো ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। তিনি বলেছিলেন, ভয়ংকর এই চেষ্টাকে প্রতিহত করতেই হবে। খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করার দাবি জানিয়ে বলেছিলেন, যে নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয় তাকে নির্বাচন বলা যায় না। খালেদা জিয়া একই সঙ্গে জনগণের দেশপ্রেমের কথাও তুলে ধরেছিলেন। বলেছিলেন, যে জাতি যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে সে জাতিকে কারও পক্ষেই পদানত করা সম্ভব নয়। যারা সে চেষ্টা করবে তাদের পরিণামই বরং অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। আওয়ামী লীগই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে কথাটাও সুনির্দিষ্টভাবেই বলেছিলেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার সেদিনের বক্তব্যে কোনো ভুল ছিল কি না, পাঠকরা তা ভেবে দেখতে পারেন। তারপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বর গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরও বিদায় নেওয়ার পর্যায়ে এসে গেছে। প্রতিটি উপলক্ষেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে ক্ষমতা স্থায়ী করার চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া অভিন্ন বক্তব্য রেখেছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ব্যস্ত রয়েছে তার দলবাজি নিয়ে। এভাবে সব মিলিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, ডিসেম্বর আসলেও বাংলাদেশের মাস স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের কারণে তো বটেই, অন্য কিছু আন্দোলনে বিশেষ সফলতার কারণেও।
লেখক: সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক