

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা ও সংকট উভয়ই এক বাস্তব ও কঠিন সত্য হিসেবে উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘জালিয়াতির জন্য বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে’—এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে অনেকের মনে নাড়া দিয়েছে। তবে এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসে, তা হলো—এ জালিয়াতির দায় কি পুরো জাতির?
বাস্তবতা হলো, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত একটি সীমিত গোষ্ঠী। তারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের অপকর্মের প্রভাব ভয়াবহ ও বহুমাত্রিক। ভুয়া নথিপত্র, ডিজিটাল প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি কিংবা অনলাইন স্ক্যাম এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে না, গোটা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতি যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, তার দায় কয়েকজন অপরাধীর, কোনোভাবেই সারা দেশের মানুষের নয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এ অল্পসংখ্যক জালিয়াতকে প্রতিহত করতে সরকার ব্যর্থ কেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, সাইবার ক্রাইম ইউনিট সবই তো আছে। তবু কেন জালিয়াত চক্র বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় থাকে? এখানে সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন।
প্রধান উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রমাণ করে বাংলাদেশিরা মেধাবী ও সৃজনশীল। কিন্তু এ মেধা যখন ভুল পথে পরিচালিত হয়, তখন তার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। প্রযুক্তি মানুষের সহায়ক হওয়ার কথা, শোষণের হাতিয়ার নয়। তাই প্রযুক্তিকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে এর অপব্যবহারকারীরা যেন কঠোরভাবে আইনের আওতায় আসে—এ বিষয়টি সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জালিয়াতির মাধ্যমে যারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শুধু মামলার খাতা খোলা যথেষ্ট নয়। দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা যায় যে, জালিয়াতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কয়েকজন অপরাধী যদি বছরের পর বছর পার পেয়ে যায়, তাহলে সৎ নাগরিকদের মধ্যে হতাশা জন্মায় এবং অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতিনির্ধারণে পুরোনো মানসিকতা। অধ্যাপক ইউনূস যে ‘চিন্তায় পিছিয়ে থাকা’র কথা বলেছেন, সেটি সবচেয়ে বড় সংকট। ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা মানে শুধু অনলাইন ফরম বা অ্যাপ নয়; এর অর্থ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানবিক প্রশাসন। সরকার যদি সত্যিই জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে দালালচক্র, জালিয়াত ও মধ্যস্বত্বভোগীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
প্রজন্মগত দূরত্বের কথাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তরুণরা প্রযুক্তিতে দক্ষ, কিন্তু নেতৃত্বে তারা অনুপস্থিত। অন্যদিকে বয়স্ক নেতৃত্ব প্রযুক্তির গতি বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে। এ ব্যবধান ঘোচাতে না পারলে জালিয়াতির মতো সমস্যাগুলো আরও জটিল হবে। তরুণদের সম্পৃক্ত করে, তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে ইতিবাচক পথে কাজে লাগাতে পারলেই প্রযুক্তি হবে দেশের শক্তি, দুর্বলতা নয়।
আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে কোনো জালিয়াতির কারখানা হিসেবে দেখতে চাই না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করা, শাস্তি দেওয়া এবং সৎ মানুষের পথ সুগম করা। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়তে হলে প্রথম শর্ত ন্যায়বিচার ও শাসনের দৃঢ়তা। এ জায়গায় ব্যর্থ হলে সব উন্নয়ন, সব এক্সপো, সব প্রতিপাদ্য শুধু শোভা হয়েই থাকবে।
মন্তব্য করুন