

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিততে নতুন লক্ষ্য হাতে নিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও মারাত্মক সামরিক কৌশল গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ইউক্রেনের লক্ষ্য প্রতি মাসে অন্তত ৫০ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা গুরুতরভাবে আহত করা, যাতে মস্কো নতুন সেনা পাঠিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পারে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত সোমবার সামরিক সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাজ হলো দখলদারদের এমন মাত্রায় ধ্বংস করা, যাতে তারা পুষিয়ে নিতে না পারে। রাশিয়া এক মাসে যত সেনা পাঠাতে পারে, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করা আমাদের লক্ষ্য। ৫০ হাজার মাসিক ক্ষয়ক্ষতিই সর্বোত্তম মাত্রা।
তিনি জানান, ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছে, যা নভেম্বরের ৩০ হাজার এবং অক্টোবরে ২৬ হাজারের তুলনায় বেশি। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, এই সংখ্যার মধ্যে এমন আহতরাও রয়েছেন যারা আর যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে পারবে না।
ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কি জানান, ডিসেম্বর মাসে ৩৩ হাজারের বেশি সেনা নিশ্চিতভাবে নিহত হয়েছে।ইউক্রেনের দাবি, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা নিহত বা আহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, রাশিয়ার মোট হতাহতের সংখ্যা ১২ লাখের কাছাকাছি, যার মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনের হতাহত প্রায় ৬ লাখ, নিহত সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার। তবে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি তারা।
বর্তমানে যুদ্ধ কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। রাশিয়া উল্লেখযোগ্য নতুন ভূখণ্ড দখলে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২২ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরুর এক মাসের মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনের এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণে নিলেও, পরবর্তী মাসে কিয়েভ, খারকিভ, সুমি ও চেরনিহিভ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
২০২২ সালের শেষভাগে ইউক্রেন খারকিভ অঞ্চলে ওস্কিল নদীর পূর্বে রুশ বাহিনীকে হটাতে সক্ষম হয় এবং রাশিয়া খেরসনের পশ্চিম তীর ছেড়ে দেয়। ফলে তখন ইউক্রেনের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার দখলে ছিল। গত তিন বছরে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে। গত ছয় মাস ধরে দোনেৎস্ক অঞ্চলের দুটি শহর দখল করতে ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেও ব্যর্থ হচ্ছে রাশিয়া।
আলজাজিরা জানিয়েছে, জেলেনস্কির কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ড্রোন। তিনি জানান, বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের ৮০ শতাংশ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে ড্রোন। গত এক বছরেই ৮ লাখ ১৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, প্রতিটি আঘাত আমরা নথিভুক্ত করছি।
ড্রোন অপারেটরদের জন্য পয়েন্টভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে রুশ সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের জন্য নগদ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়, যেখানে একটি যুদ্ধট্যাংক দখলের জন্য পুরস্কার ছিল ২৩ হাজার ডলার। এই মাসে জেলেনস্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন মিখাইলো ফেদোরভকে। তিনি আগে ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রী ছিলেন। তার নেতৃত্বে ড্রোন উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে।
এদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে। গত শনিবার ৩৭৫টি ড্রোন ও ২১টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালানো হামলায় দেশজুড়ে প্রায় ১২ লাখ বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। কিয়েভে এখনো প্রায় ৭ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল। পরিস্থিতি সামাল দিতে উষ্ণতা কেন্দ্র ও সহায়তা পয়েন্ট চালু করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন