কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৪, ০২:৫৩ এএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৭:৩৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আর কত মৃত্যু দেখতে হবে

দীপংকর গৌতম
আর কত মৃত্যু দেখতে হবে

নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বঙ্গবাজারের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন নাম বেইলি রোড। আমরা দেশের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে তাকালে দেখি শহর, নগর থেকে মহানগর, অজস্র টাওয়ার, অজস্র হোটেল, অজস্র ক্লিনিক হয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের বড় একটি প্রতিনিধিত্বকারী দিক হলো। কী সুন্দর আলিশান সব বাড়ি চোখ ধাঁধিয়ে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সব কক্ষ কী সুন্দর সাজানো-গোছানো। লিফট আছে কত ধরনের। কিন্তু সরু একটা সিঁড়ি। বিকল্প এক্সিটওয়ে নেই, নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। অন্যদিকে আগুন লাগলে এসি ভবনে বাতাস থাকে না, ফলে কার্বন মনোক্সাইড নামের বিষাক্ত গ্যাস জায়গা করে নেয়। কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের কারণে ও অক্সিজেনের অভাবে মানুষ মারা যায়। বেইলি রোড ট্র্যাজেডিতে নিহত ৪৬ জনই গত বৃহস্পতিবার রাতের অগ্নিকাণ্ডে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ে মারা গেছেন। সহজ ভাষায় যাকে বিষাক্ত ধোঁয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। এ কথা গণমাধ্যমে বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিটপ্রধান (অরেঞ্জ) প্রবীর চন্দ্র দাস। মৃত একজনের গায়ে কোনো ক্ষতচিহ্ন ছিল না। এত আলিশান ভবনের ভেতরেও মানুষের নিরাপত্তা নেই। বড় একেকটি দুর্ঘটনার পর আমরা কিছু মুখস্থ কথা শুনি। হাউসের অনুমোদন ছিল না, বারবার নোটিশ করা হয়েছে, মালিকপক্ষের গাফিলতি আছে। সবই যদি এমন হয় তাহলে রাষ্ট্রের কাজটা কী? রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহল কেন হাউসটিকে সিলগালা করে দেয় না। রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস ট্র্যাজেডিতে আমরা দেখেছি, সিঁড়ি এত সরু যে, নামতে না পেরে বেশিরভাগ মানুষ মারা গেছেন ধোঁয়ার কারণে। সবকিছু জানার পরও কোনো ভবনমালিক সিঁড়িটাকে প্রশস্ত করতে চান না। লিফটের বাহারি আয়োজনের মধ্যে মানুষকে আকর্ষণ করা বাণিজ্যিক বিষয়টি মাথায় রেখে চলেন। মুনাফার লোভে সিঁড়ি কোনোরকমে তৈরি করেন। একবারও ভাবেন না যে কোনো সময় আগুন লাগতে পারে, তখন মানুষ কোথায় যাবে? সবকিছুর পরও রাজধানী থেকে দেশের মানুষ এত বড় দুর্ঘটনায় শোকাহত। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে পুড়ে গেছে গ্রিন কোজি কটেজ। অগ্নিনিরাপত্তার অভাবের বিষয়টিই এখানে প্রধান। ভবনের সাজসজ্জাকে মুখ্য ও নয়নাভিরাম করতে যেসব কাঠের ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই দাহ্য। তারপর গ্যাস সিলিন্ডার তো আছেই। সব মিলে ঢাকার আলিশান ভবনগুলোকে খুবই অরক্ষিত টাইমবোমার মতো মনে হয়। যার মূর্ত প্রকাশ রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের বহুতল ভবনটি। যে আগুনের ঝুঁকি ছিল, তা জানত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা। তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ভবন কর্তৃপক্ষও গায়ে মাখেনি। মানুষের মৃত্যুর পর বেরিয়ে এসেছে গাফিলতির চিত্র। গাফিলতি বা গুরুত্ব না দেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার রাতের আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের বহুতল ভবনে আগুনের ভয়াবহতা ও মৃত্যুর পর অনেকেই বলছেন, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আগুনের ঝুঁকি ও অনুমোদন না থাকার পরও ভবনটিতে আটটি রেস্তোরাঁ চলছিল বছরের পর বছর ধরে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সেখানে খেতে ভিড় করেছিলেন নগরের বাসিন্দারা। কেউ গিয়েছিলেন শিশুসন্তানদের নিয়ে, কেউ গিয়েছিলেন স্বজনদের নিয়ে, কেউ গিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। কারও কারও জীবন চলত ওই ভবনে থাকা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে।

আগুন লাগলে, প্রাণ বাঁচাতে মা সন্তানকে নিয়ে, বোন বোনকে নিয়ে, বন্ধু বন্ধুকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভবনের ছাদে, বিভিন্ন তলায়। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে রাত পৌনে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর বের করে আনা হয় একের পর এক নিথর দেহ। ঘটনার সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভিড় বাড়ছিল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বেলা যত বাড়তে থাকে, তাদের কাছ থেকে ততই জানা যেতে থাকে সব মর্মস্পর্শী ঘটনা। বেইলি রোডের ভবনে আটকে থাকা অবস্থায় ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বাবাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আব্বু, আগুন! আমাদের বাঁচান...।’ সেই শেষ কথা। পরে মেয়ের মোবাইল ফোনে শতবার ফোন করেছেন বাবা। তবে ফোন আর কেউ ধরেনি। শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট হাসপাতালের কাছে দাঁড়িয়ে স্বজনরা চিৎকার করে কাঁদেন। গত ১৪ বছর ধরে এভাবেই একেকটি মর্মান্তিক ঘটনায় আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ করে। কোনো হৃদয়বান মানুষ এখানের আহাজারি শুনে স্বাভাবিক থাকতে পারেন না। তারপরও একের পর এক ঘটনা ঘটছেই। বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর জানা যায়, ভবন বহু আগে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সব মুখস্থ কথা। আমরা বলি সংকট থাকলে শুধু নোটিশ কেন, ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়?

ঢাকায় আগুনে মৃত্যুর খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যম বিবিসি, সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, এএফপি, এপি এবং আলজাজিরার মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বঙ্গবাজারের খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তন কোথায়? পরিবর্তন নেই, সবই আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। এ দুর্ঘটনার পর আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আবার আরেকটি ঘটনা এ ঘটনাকে পেছনে ফেলে দেবে। নতুন ঘটনা নিয়ে আবার স্বজন হারানো আহাজারি, আবার পরিকল্পনাবিদরা বলবেন সব মুখস্থ বুলি। কিন্তু যার যায়, তার যায়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের ধারণা, আগুন লেগেছে সিঁড়ির কাছের কোনো দোকান থেকে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে সিঁড়ি দিয়ে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ভবনে সিঁড়ি একটি। ফলে ওপরের তলায় থাকা মানুষরা আটকা পড়েন। রেস্তোরাঁর সবকটিই ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কাচ দিয়ে ঘেরা থাকায় বাইরে থেকে বাতাস আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ ছিল। রাজউকের নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিমত, ভবনটির অষ্টমতলাটির আবাসিক অনুমোদন রয়েছে। এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে তা শুধু অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এ অনুমোদন। রেস্তোরাঁ, শোরুম (বিক্রয়কেন্দ্র) বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

অনুমোদন না নিয়ে ভবনটিতে কী কী প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে, তা তদারকি করেনি রাজউক। কেন করেনি? তার জবাব কে দেবে? ঢাকা শহরভরা রেস্টুরেন্ট। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। পুঁজির অসম বিকাশের মধ্য দিয়ে সংকট বাড়ছে, বাড়ছে টাকাও। কিন্তু এ পুঁজি কল্যাণকর নয়। এটা শুধু মুনাফা বোঝে, মানুষ বোঝে না। বাবা-মা-স্বজনের কান্না এরা টের পায় না। কিন্তু যাদের কেউ মারা গেছে তাদের দিন কাটবে এক ভয়াবহ ক্ষত নিয়ে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।

কোনো ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলে ফায়ার সার্ভিস নোটিশ টানিয়ে দিতে পারে। মামলা করতে পারে। তবে মূলত দরকার সরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ও সমন্বয়। সেটা না হলে এমন অঘটন কত ঘটবে আমরা জানি না। গ্রীষ্মকাল আসছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা আর কত মৃত্যু আর কত ভয়াবহতা আমাদের দেখতে হবে?

লেখক: কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

বাংলাদেশের ম্যাচসহ টিভিতে আজকের যত খেলা

এইচআর বিভাগে নিয়োগ দিচ্ছে ম্যাটাডোর বলপেন

টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

শনিবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

২৯ নভেম্বর : আজকের নামাজের সময়সূচি

বিএনপির দুই নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

খালেদা জিয়া কেমন আছেন, সর্বশেষ তথ্য জানালেন আসিফ নজরুল

বগুড়া বার সমিতির নির্বাচনে সভাপতি ও সা.সম্পাদকসহ ১০ পদে বিজয়ী বিএনপি

নারায়ণগঞ্জে কারানির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মীদের সংবর্ধনা সমাবেশে মাসুদুজ্জামান

১০

আপনার সুস্থতায় সাহস পায় বাংলাদেশ : নাছির উদ্দীন নাছির

১১

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরে জামায়াত আমিরের উদ্বেগ

১২

খালেদা জিয়াকে নিয়ে হাদির আবেগঘন বার্তা

১৩

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর নিতে মধ্যরাতে হাসপাতালে আসিফ নজরুল

১৪

জামায়াতের সাবেক আমিরের কবর জিয়ারত করলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু

১৫

খালেদা জিয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টার দোয়া কামনা, তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা

১৬

নির্বাচিত হলে সব চাঁদাবাজি ও অনিয়ম দূর করব : আবদুল আউয়াল মিন্টু

১৭

আমি জনগণের শাসক নয়, সেবক হতে চাই : খন্দকার আবু আশফাক

১৮

১৯ দেশের অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড আবার যাচাই করবে যুক্তরাষ্ট্র

১৯

মাদক চোরাচালান চক্রের মূলহোতাসহ ২ সহযোগী গ্রেপ্তার

২০
X