শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০
সাইদুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫২ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৩৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

এমপির নির্বাচনী ব্যয় তোলা—মাজেজা কী

এমপির নির্বাচনী ব্যয় তোলা—মাজেজা কী

‘সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করতে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এই টাকা আমি তুলব, তা যেভাবেই হোক। এটুকু অন্যায় আমি করব, আর করব না’—এ বক্তব্যটি নাটোর-১ লালপুর আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে এ টাকা তার খরচ হয়েছে বলে তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। তার এমন বক্তব্যকে আমি একটি সাহসী বক্তব্য বলব। কারণ এ একটা বক্তব্য দিতে তাকে কিন্তু অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস, একজন আইন প্রণেতা হিসেবে না জেনে-বুঝে এমন বক্তব্য তিনি দেননি। কারণ তিনি এর আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন।

এখন এমন একটা বক্তব্য যেটাকে সবাই সমালোচনা করছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বক্তব্য ভাইরাল সেই বক্তব্যকে কেন আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি। জানাচ্ছি এ কারণে যে, তিনি অন্তত সাহস করে প্রকাশ্য জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে নির্বাচনে কত টাকা খরচ করেছেন তা সাহস করে বলেছেন।

আমাদের দেশে নির্বাচনগুলোতে একজন প্রার্থী কত টাকা খরচ করেন তা সাধারণত বলেন না। যদিও নির্বাচন কমিশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব

আর নির্বাচনের খরচের কথা উল্লেখ করতে হয় কিন্তু সেটা অনেকটা বলার জন্য বলার মতো। তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। একটা নির্বাচন করতে কত টাকা, কোথায় কোথায় খরচ করতে হয় তা শুধু যিনি নির্বাচন করেন তিনিই জানেন। কিন্তু সেটা পাবলিকলি প্রকাশ হয় না। তো আবুল কালাম আজাদ সাহেব তা প্রকাশ করেছেন, এটাকে পজিটিভলিই ভাবা উচিত বলে আমার মনে হয়।

অন্য এমপিরা যদি তাদের নির্বাচনী খরচের এমন চিত্র তুলে ধরে প্রতিশ্রুতি দিতেন যে, এই টাকা তোলার পর আর অন্যায় করব না; তাকেও আমি স্বাগত জানাব। কারণ একজন এমপি বর্তমানে একটা আমলে কত টাকা কামায় তার হিসাবটা আন্দাজ করা কারও জন্যই খুব কঠিন না মনে হয়। সেখানে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা খুব নগণ্যই মনে হয় আমার কাছে।

অন্যায় করে হলেও এ টাকা তুলবেন এমপি সাহেব, এ কথাটার মাজেজা কী? একজন আইন প্রণেতা কি এভাবে প্রকাশ্যে বলতে পারেন যে তিনি অন্যায় করে হলেও তার নির্বাচনে খরচ হওয়া টাকা তুলে নেবেন? তার এ টাকা কি বৈধভাবে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই?

চলুন দেখি একজন এমপি বৈধভাবে কী কী সুযোগ-সুবিধা পান। নির্বাচিত হওয়ার পর ন্যাম ফ্ল্যাটে তারা একটি করে ফ্ল্যাট পান; যতদিন তারা এমপি থাকবেন, ততদিন সেখানে থাকতে পারবেন। শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যক্তিগত গাড়ি অনেক কম দামে আমদানির সুযোগ পান। এর বাইরে একজন এমপি প্রতি মাসে বেতন ৫৫ হাজার, নির্বাচনী এলাকার ভাতা ১২ হাজার ৫০০, সম্মানী ভাতা ৫ হাজার, পরিবহন ভাতা ৭০ হাজার, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচ ১৫ হাজার, লন্ড্রি ভাতা দেড় হাজার, মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ৬ হাজার, টেলিফোন ভাতা ৭ হাজার ৮০০, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার, স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পান। এ ছাড়া একজন এমপি পাঁচ বছরের জন্য একটা থোক বরাদ্দ পান, যেটা আগে ছিল ৫ কোটি, যা বর্তমানে ২০ কোটি টাকা। থোক বরাদ্দের টাকা একজন সংসদ সদস্য তার নিজের পছন্দমতো উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ করতে পারেন। এ টাকা কোন উন্নয়নে কীভাবে খরচ করবেন সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন সংসদ সদস্যকে কে কি এক-দুই কোটি টাকা তুলতে অন্যায়ের আশ্রয় নিতে হবে বা প্রয়োজন আছে? মোটেও না। ধরেন একটা শুল্কমুক্ত দামি গাড়ি আমদানি করেই তো তিনি এ টাকার অর্ধেকটা বা তার বেশি তুলে ফেলতে পারেন। আর থোক বরাদ্দের যে টাকা খরচ করবেন তা তো তার নিজস্ব এখতিয়ার। নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রতিশ্রতি রক্ষায় যে থোক বরাদ্দটা দেওয়া হয়, তার হিসাব কি মানুষ চায় বা মানুষ পায়? সুতরাং এখানেও তিনি কত টাকা তুলে নিতে পারেন তার একটা চিন্তা করাই যায়।

ফ্ল্যাটের হিসাব বাদ দিলেও শুধু বেতন আর অন্যান্য সুবিধা মিলে মাসে একজন এমপির আয় প্রায় ২ লাখ টাকা। বছরে প্রায় ২৪ লাখ টাকা, যা পাঁচ বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তিনি যদি এমপি না হতেন, এ বৈধ সুবিধাগুলো কি তিনি পেতে? এ ছাড়া এমপিদের জন্য স্বেচ্ছাধীন তহবিল নামে একটি বার্ষিক ৫ লাখ টাকার তহবিল আছে। এটা তিনি দান-অনুদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের চিকিৎসা সুবিধা তো আছেই।

এতসব সুবিধা থাকার পরও একজন এমপির নির্বাচনী খরচ ওঠাতে কি অন্যায়ের আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন আছে? তারপরও কেন এমপি সাহেব এমন কথা বললেন? কারণ তিনি জানেন, এমপি সাহেবরা কত টাকা আয় করেন। কোন পথে আয় করেন। নির্বাচনে কত টাকা খরচ করেন।

এখন প্রশ্ন আসে নির্বাচন কমিশন তো এমপিদের নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দেয় এবং সেই ব্যয় তিনি কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন তাও ঘোষণা দিতে হয়। তাহলে এত টাকা কীভাবে খরচ হয় নির্বাচনে? অতিরিক্ত খরচের কারণে কি তার সংসদ সদস্য পদকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না?

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী দলীয় অনুদানসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী খরচ ২৫ লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না। ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ ১০ টাকা নির্ধারণ করেছিল কমিশন।

আরপিও অনুসারে প্রার্থীরা নির্বাচনের পর ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দিলে দুই থেকে সাত বছরের জেল হতে পারে। দ্বাদশ নির্বাচনে বিজয়ী এমপিরা কি এ হিসাব দিয়েছেন?

আমাদের দেশে ভোটের যে কালচার তাতে একজন এমপিও মনে হয় এই টাকায় নির্বাচন করতে পারেন না। কিন্তু ব্যয়সীমা লঙ্ঘন হলো কি না, তা দেখার কোনো চেষ্টা বা উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন কখনো নেয় না। ব্যয়সীমা অতিক্রম করায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নজির কি আছে আদৌ? কিংবা অতিরিক্ত ব্যয় করলে তার কী শাস্তি হবে, তার কি কোনো সুনির্দিষ্ট উদাহরণ আছে?

একজন এমপি যখন পাবলিকলি বলছেন তিনি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা খরচ করেছেন, তখন তো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে তার টাকার সোর্সটা কী? কীভাবে এত টাকা ব্যয় করলেন? অতিরিক্ত খরচ করলে তার কী শাস্তি হবে?

তারপরও আবুল কালাম আজাদ সাহেব যে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সরলভাবে স্বীকার করেছেন নির্বাচনী ব্যয় তোলার পর তিনি আর অন্যায় করবেন না—এমন প্রতিশ্রুতি নিজের এলাকার মানুষের কাছে অন্যরাও দেন না। পাঁচ বছর পর মানুষকে জানান যে, আপনি এভাবে-ওভাবে নির্বাচনী ব্যয় তুলে নিয়েছেন। এত টাকা আয় করেছেন। তবুও মানুষ জানুক একজন এমপি নিজের বয়ানে আর কাজে কতটা স্বচ্ছ। আর জনগণের টাকায় এতসব ‍সুবিধা ভোগ করার পর জনগণের জন্য কী করলেন সেই হিসাবটাও করুন।

লেখক: সাংবাদিক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আড্ডা দিচ্ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মীরা, অতর্কিত হামলায় আহত ৪

চৈত্রসংক্রান্তি আজ

১৩ এপ্রিল : নামাজের সময়সূচি

দুদিন বন্ধের পর আজ থেকে মেট্রোরেল চালু 

মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার হুমকি ইরানের

বিমান থেকে সংকেত দেখেই দ্বীপ থেকে তিন নাবিককে উদ্ধার

বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুই মাদ্রাসাছাত্র নিহত

সৌদি আরবে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ গেল বাংলাদেশির

এবারই প্রথম স্বস্তিতে মানুষ ট্রেন ভ্রমণ করছেন : রেলমন্ত্রী

খুলনায় ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ গেল শিশুর

১০

দিনদুপুরে তরুণীকে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল

১১

ঈদে পর্যটকে মুখরিত মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত

১২

‘বাঙালিত্বের সঙ্গে ধর্মের কোনো সংঘর্ষ নেই’

১৩

খুলনায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আ.লীগের তিন নেতা গুরুতর আহত

১৪

সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াল বান্দরবান প্রশাসন

১৫

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা চরমে, মার্কিন রণতরীর অবস্থান পরিবর্তন

১৬

দুঃসংবাদ দিল আবহাওয়া অফিস

১৭

মসজিদের টাকার হিসাবকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ১২

১৮

স্ত্রী-সন্তানকে মাংস কিনে খাওয়াতে না পারায় চিরকুট লিখে আত্মহত্যা

১৯

মারাঠা বর্গীদের মতো দেশে লুটপাট চলছে : বিএসপিপি 

২০
*/ ?>
X