উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি ও সরকারগুলো বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলবে—এটাই স্বাভাবিক। কয়েকদিন আগে শান্ত দেশ ভুটানের রাজা ঘুরে গেলেন। পরিবেশগত ভারসাম্য আর শান্তিতে তারা এগিয়ে আছে। এই দেশ আমাদের স্বীকৃতি দিতে কালবিলম্ব করেনি। সে থেকে আজ পর্যন্ত সম্পর্ক অটুট। কিন্তু ভুটান ও বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। আমরা রাজতন্ত্রের দেশ ছিলাম না। হবও না। আমাদের গণতন্ত্র আর জনশাসনেই মুক্তি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সবসময় অম্লমধুর। প্রতিবেশী প্রায় সব দেশের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভালো হলেও জনগণ ভারতবিদ্বেষী। এর নানাবিধ সামাজিক ও আর্থিক কারণ আছে। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ভারতের সাহায্য আর সমর্থন এদেশের এক শ্রেণির মানুষকে শান্তি দেয়নি। তাদের দালালরা আজও চলমান। কিন্তু ভারতের উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলেও বহু খাতে আমরা এগিয়ে গেছি।
শ্রীলঙ্কার কথা বলতে হলে এটা বলতে হবে, এই সেদিন সে দেশে যখন আর্থিক খাতে ধস নেমেছিল, তখন আমরা তাদের টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলাম। সে পাওয়ার আজ বাংলাদেশের হস্তগত। বাকি থাকল পাকিস্তান। উন্নয়ন-প্রগতিতে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান এখন নতজানু। তাদের মাথা-মগজওয়ালা মানুষরা বারবার বলেন, আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ স্মার্ট দেশের দিকে ধাবিত হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
উপমহাদেশের এমন পরিবেশের ভেতর কেমন চলছে স্মার্ট বংলাদেশের অভিযাত্রা? এর উত্তর চাইলে আমাদের যেটা জানতে হবে, তা হলো কারা আমাদের নেতা আর কে বা কারা আমাদের সে দিকে ধাবিত করবেন। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপ্রতিরোধ্য এক নেতা। যিনি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের অনেক সমস্যা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তার কারণেই বহু সমস্যা মাথা তুলতে পারেনি। তার নেতৃত্বে আমরা পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছি। এসবই সত্য।
কিন্তু তারপর কী? দ্বিতীয় বা পরের লাইনে যে নেতারা তাদের ওপর মানুষের আস্থা কতটা? একটা দেশ বা সমাজ যখন স্মার্ট হবে বলে প্রতিজ্ঞা করে, তখন তার জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়ায় আধুনিকতা। সমাজ কি সে জায়গায় আছে? বাংলাদেশ তো শুধু গুলশান, বনানী, বারিধারা বা চট্টগ্রামের কিছু পশ এলাকা নয়। বিস্তৃত গ্রাম, মফস্বল আর শহরগুলোও বাংলাদেশ। সেসব জায়গায় আমরা কি আধুনিকতার ছোঁয়া দেখতে পাই? আধুনিকতা আসলে কী? নতুন কাপড়, নতুন জুতা, নতুন বাড়ি? না বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া? আমি দেশে গিয়ে যেটা অনুভব করেছি—অঢেল টাকার কারণে এক শ্রেণির মানুষ মনে করে, টাকা খরচ করে দামি হোটেলে খাওয়া, বিলাসবহুল রিসোর্টে থাকা আর দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরিধান করাই আধুনিকতা। এটা যে ভুল এবং মারাত্মক ভুল, তার প্রমাণ সমাজের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে।
বিজ্ঞান ও চিত্রকলা এসব বিষয়ে বিপাকে আছে। তাদের ভয় পায় অন্ধ মানুষজন। কারণ সবার জানা। বিজ্ঞান চোখ খুলে দেয়। চিত্রকলা খুলে দেয় মনের দুয়ার। কবিতা শিল্প জানালার মতো কপাট খুলে ডাকে। অন্ধরা এসবে ভীত। তাদের জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেলে ব্যবসা লাটে উঠবে। সাম্রাজ্য ধসে পড়বে। কী এই সাম্রাজ্য? খুব সহজ। দীর্ঘদিনের অবাস্তব পাঠক্রম আর লোভের কারণে আমাদের চারপাশে গড়ে উঠেছে প্রলোভনের বলয়। আমি দেশে গিয়ে দেখেছি টাকা, মাদক আর নারীর লোভে মত্ত মানুষের আর কোনোদিকে তাকানোর ফুরসত নেই। সে ফাঁকে সমাজে কিশোর গ্যাং, নারী গ্যাং, পুরুষ গ্যাং আরও কত কী গড়ে উঠেছে। এদের নির্মূল না করা পর্যন্ত আপনি ভালো দেশ, ভালো সমাজ পাবেন না । স্মার্ট তো আরও দূরের কথা।
স্মার্ট বাংলাদেশ মানে কোনো পরিসংখ্যান বা হিসাবনিকাশ নয়। এর একটা বাস্তব ভিত্তি হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা। সে জায়গাটি এখনো স্মার্ট হয়নি। যে কারণে আমরা প্রায়ই পাঠ্যবইয়ে ভুলভ্রান্তি আর মারাত্মক সব অনিয়মের খবর পাই। যেসব অনিয়ম দূর করা যায় তার জন্য ভাবি না। ভাবি, কবিতা বাতিল শব্দের কারণে আর লেখা বাতিল অন্ধদের খুশি করার জন্য। স্মার্ট শব্দটাই এসব পছন্দ করে না। সে নিয়মের ভেতর দিয়েই উদ্দাম আর খোলামেলা। এর নির্যাস নিতে না জানলে সমাজ কীভাবে আধুনিক হবে?
সবার আগে আমাদের শিশু-কিশোর ও তারুণ্য। তাদের জন্য খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত বিনোদন আর ভালোবাসাও কিন্তু স্মার্ট দেশের উপকরণ। তা না হলে সুষম বিকাশ হয় না। যেসব দেশ বা সমাজ আধুনিক, যারা স্মার্ট তাদের শ্রেণিগত বৈষম্য কম। থাকলেও তা চোখে পড়ে না। তাদের চিকিৎসা, গৃহ আর আহার নিশ্চিত। দামের আগুনে পুড়ে কোনো সমাজ খাঁটি হতে পারে না। দামের চাপ কমাতে সরকার চেষ্টা করছে, এটা সত্য। কিন্তু সহনীয় থাকতে হবে পুরো সময়। নয়তো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটা স্মার্ট দেশের প্রথম শর্ত।
যেভাবেই হোক, বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির পরও দেশ থেমে থাকেনি। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে স্মার্ট হতে চাই, নেতাদের এদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বন্ধ করতে হবে অর্থ পাচার। বন্ধ করতে হবে টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। এগুলো সবাই জানে। সবাই বলে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নদেখা নেতারা তা বন্ধ করতে পারেন না।
আমরা শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করি। আস্থা রাখি তার কাজে। তাই একটাই চাওয়া, কথায় নয় কাজে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু হোক। সে যাত্রায় অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, শক্তিশালী বিরোধী দল আর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার বিকল্প কোথায়? সেসব হলেই পথ খুলে যাবে। মেধা আর শ্রমের বাংলাদেশ তার গন্তব্য খুঁজে পাবে আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশের ভেতর। সে স্বপ্ন এখন হাতের মুঠোয়। শুধু আমাদের পথ তৈরি করে দেওয়ার দেরি। দেশ তৈরি করে নেতা, তাকে এগিয়ে দেয় মানুষ—এটাই আমাদের ইতিহাস। আমাদের ভবিষ্যৎও সে পথেই মুক্তি খুঁজে পাবে।
লেখক: ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক, সিডনিপ্রবাসী