সরকারি কেনাকাটায় সর্বগ্রাসী দুর্নীতি অব্যাহত আছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি’ গ্রহণ করার কথা বলা হলেও বাস্তবে আমরা এর উল্টো চিত্রই প্রত্যক্ষ করছি। প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে দুর্নীতির খবর। প্রকৃত দরের চেয়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো এখন গা-সওয়া বিষয় হয়েছে। এ ধরনের খবর এখন আর মানুষকে উদ্বিগ্ন করে না।
সোমবার কালবেলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাঁজোয়া যান কেনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে নেওয়া ওই প্রকল্পে দরপত্রের নিয়ম ভঙ্গের পাশাপাশি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যান কেনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে নিয়ে আসা হয়েছে এসব নিরাপত্তা যান। যেখানে দেখা যাচ্ছে, বাজারদরের চেয়ে অন্তত ৩০০ শতাংশ বেশি অর্থ খরচ হয়েছে। বিশেষ নিরাপত্তা অস্ত্র সংযুক্ত ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়ি কেনা হয়েছে ৬ কোটি টাকায়। এভাবে চারটি গাড়ি কিনতে খরচ হয়েছে ২৪ কোটি টাকা। র্যাবের সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ৩৩ কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের অধীনে ১ হাজার ৩৭৫টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন কেনার সিদ্ধান্ত হয়। ২৬টি আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) বা সাঁজোয়া যান কেনার সিদ্ধান্ত ছিল সেই প্রকল্পের অংশ, যার মধ্যে চারটি এপিসি দেশে পৌঁছে গেছে। আরও ৫০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ফের ১০টি এপিসি কেনার আবেদন করা হয়েছে। হিসাব বলছে, এরই মধ্যে কেনা চারটি গাড়িতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। বাকি ২২টি সাড়ে ৬ কোটি টাকা করে কিনলে ক্ষতি হবে ৯৯ কোটি টাকা। ‘র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের পর যানবাহন কিনতে মূল্য নির্ধারণী কমিটি গঠন করা হয়। গত বছর ৩০ নভেম্বর র্যাব সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সভা করে কমিটি। ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে ছয়টি জলযানসহ ১ হাজার ৩৭৫টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন অন্তর্ভুক্ত। এসব যানবাহনের মধ্যে ৭৩৫টির ক্রয়মূল্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দর অনুযায়ী প্রস্তাবিত। বাকি ৬২৪টির বাজারদর বিবেচনায় ডিপিপির মূল্য বহাল রাখা হয়। যেখানে প্রস্তাবিত প্রতিটি এপিসির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি টাকা করে।
২০১৯ সালে বালিশ এবং পর্দাকাণ্ডের কথা আমাদের অনেকেরই মনে আছে। দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল ঘটনা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের হাউসিং প্রকল্পে ফ্ল্যাটে একেকটি বালিশের দাম দেখানো হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা করে। এ ছাড়া ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আইসিইউতে ব্যবহৃত একটি পর্দার দাম দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ টাকা। বালিশ এবং পর্দাকাণ্ডের ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এরপরও এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকা বিস্ময়কর। সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণের নামে যে বিলাসিতা চলছে, তা নিয়েও সমালোচনা কম হয়নি। একইভাবে জনগণের কম্বল বিতরণসহ সড়কের ক্ষেত্রেও নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার দেখা যায় অহরহ। এভাবে তালিকা করলে অনিয়ম আর দুর্নীতির খবর যে বাড়তেই থাকবে। দুর্নীতির রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটে এবং জনগণের অর্থ ব্যক্তির ভোগে ব্যবহৃত হয়। বলা বাহুল্য, এ ধরনের দুর্নীতির দায়ভারও শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। এভাবে দুর্নীতি-অনিয়ম আর চলতে দেওয়া যায় না।