মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পোড়া রোগীর চিকিৎসায় নতুন আশার আলো

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি
পোড়া রোগীর চিকিৎসায় নতুন আশার আলো

সুস্থ মানুষ বাতাস থেকে গড়ে ২১ শতাংশ অক্সিজেন গ্রহণ করে। কোনো কারণে শ্বাসনালি পুড়ে গেলে ওই পরিমাণ অক্সিজেন শরীরে পৌঁছায় না। তখন পুড়ে যাওয়া শ্বাসনালি ফুলে সংকুচিত হয়ে আসে। এতে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির (এইচবিওটি) মাধ্যমে শ্বাসনালি পোড়া রোগীর শরীরে সঠিক উপায়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব। যা শ্বাসনালিকে সংকুচিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। আশার দিক হচ্ছে, সম্প্রতি শ্বাসনালি পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট অত্যাধুনিক হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি (এইচবিওটি) চালু করেছে। থেরাপিটি ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের রোগীদের চিকিৎসায়ও কাজে লাগছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম। তাই দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সেবাটি দ্রুত সম্প্রসারণ করা গেলে বহু রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বার্ধক্যের প্রভাব কমাতেও থেরাপিটি খুব কার্যকর বলে মনে করা হয়। থেরাপির মাধ্যমে ত্বকে নতুন কোষ তৈরি হয়, ত্বকে টোন পড়ে। ত্বক দীর্ঘ সময় ধরে তরুণ ও সুস্থ দেখায়। উন্নত বিশ্বে অনেক তারকা, সেলিব্রেটির কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ক্রীড়াবিদ, মহাকাশচারী, ডুবুরি ও পাইলটদেরও এই থেরাপি দেওয়া হয়। দেশের চিকিৎসা খাতে এ ধরনের আধুনিক থেরাপির পরিধি বাড়লে শুধু জটিল রোগেই নয়, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি বছর বিভিন্নভাবে ৮ লাখ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়। বর্তমানে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন এবং প্রতি লাখে ১১৪ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত। এই রোগীদের অনেকের চিকিৎসায় হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির প্রয়োজন হয়।

এ বিষয়ে কথা বলেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বার্ন প্লাস্টিক অ্যান্ড কসমেটিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ রবিউল করিম খান পাপন। যিনি হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রবিউল করিম বলেন, আমরা বাতাস থেকে ২১ শতাংশ অক্সিজেন গ্রহণ করে থাকি। ওই অক্সিজেন প্রথমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, এরপর হৃৎপিণ্ডে যায়। সেখান থেকে রক্তের মধ্য দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছায়। তবে টিস্যু লেভেলে দেখা যায়, ১ থেকে ২ শতাংশ অক্সিজেন ব্যবহার হয়। কিন্তু দুর্ঘটনায় যখন শ্বাসনালি পুড়ে যায়, তা দিয়ে ২১ শতাংশ অক্সিজেন শরীরে পৌঁছাতে পারে না। তখন শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া অনেক ক্যান্সার ও স্ট্রোকের রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পৌঁছায় না, তাদের এই থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া যায়। যাদের শরীরে ফোলাভাব আছে, তারাও এ থেরাপি ব্যবহার করতে পারেন। এটি রক্ত প্রবাহকে উন্নত করে। শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে নতুন শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হয়, শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। যেসব ডায়াবেটিস রোগীর রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়, তাদেরও এ থেরাপি দেওয়া যায়।

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গিয়ে বেশ কয়েকজনকে এইচবিওটি থেরাপি নিতে দেখা যায়। সেখানে কথা হয় জরায়ুমুখ ক্যান্সারের রোগী মুশফিকা নাহার মাসুমার সঙ্গে। তিনি জানান, ক্যান্সার আক্রান্তের পর ২৫টি রেডিওথেরাপি এবং ১১টি কেমোথেরাপি নিয়েছেন। ওই সময় রেডিয়েশন (বিকিরণ) সিসটাইটিসের কারণে প্রস্রাবের নালি দিয়ে ইন্টারনাল ব্লিডিং (রক্তক্ষরণ) হচ্ছিল।

চিকিৎসকরা জানান, হাইপারবারিক থেরাপি দিয়ে ক্ষত শুকানোর মাধ্যমে রক্তক্ষরণ বন্ধসহ রক্ত ও টিস্যুতে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। মাসুমা জানান, শুরুতে থেরাপি নিতে ভারতে যান। পরে জানতে পারেন দেশেই জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। মাত্র ৫০০ টাকায় সেবা নেওয়া যায়। তারপর থেকে এখানে থেরাপি নিচ্ছেন। দুই মাসে ৬০টি সাইকেল (থেরাপি) নিতে হবে। এরই মধ্যে ২৫টি শেষ হয়েছে। আগের চেয়ে এখন বেশ সুস্থ বোধ করছেন মাসুমা।

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি ইউনিটের ইনচার্জ কাজী শিহাব বলেন, কারও পাকস্থলিতে বিষ গেলে ওয়াশ করা যায়। কিন্তু ফুসফুসে কার্বন-মনোক্সাইড গেলে তা বের করা কঠিন। থেরাপির মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া রেডিওথেরাপি নেওয়ার পর অস্ট্রিও-রেডিওটিক আলসার (ক্ষত বা ঘা) হয়ে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে এ থেরাপিতে সুফল পওয়া যায়। ডায়াবেটিক ফুটের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েও ঘা না শুকানো, অটিস্টিক শিশুদের মানসিক বিকাশেও এ থেরাপি দেওয়া হয়। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৬ থেকে ১০ জন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এ সেবা নিচ্ছেন।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম বলেন, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি নিতে চেম্বার মেশিনে ৬০ থেকে ৯০ মিনিট বসে বা শুয়ে থাকতে হয়। রোগী ভেতরে শুয়েই চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। চেম্বারের ভেতরে ১০০ শতাংশ অক্সিজেন দিয়ে চাপ দেওয়া হয়। যার কারণে চাপ বেড়ে যায় এবং ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি অক্সিজেন রক্তরসে প্রবেশ করে। কোষে অক্সিজেন পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে কোষগুলো নতুন জীবন পেতে শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ নিরাময় হয় এবং নতুন কোষ গঠন শুরু করে।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, প্রথম ২০১৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জন্য দুটি হাইপারবারিক মেশিন কেনা হয়। ওই সময় চকবাজারের আগুনে দগ্ধদের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রেখেছিল এ মেশিন। এর আগে দেশে এ ধরনের দগ্ধ রোগীদের জীবন বাঁচানোর আশা করা যেত না। বর্তমানে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটেই ছয়টি মেশিন রয়েছে। এগুলো রোগীদের মধ্যে আশা জাগাচ্ছে। ভারতসহ অন্যান্য দেশে এ চিকিৎসার ব্যয় অনেক বেশি। তাই দেশে থেরাপিটির সেবার পরিধি বাড়াতে পারলে মানুষ উপকৃত হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গভবনে আজ প্রথম অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

জাবির নতুন ট্রেজারার ড. সোহেল রানা

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯ শিক্ষার্থীকে ‘ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান

হাসপাতাল মানুষের আস্থার কেন্দ্র: তথ্যমন্ত্রী

একটি দল এখন ‘টেলিগ্রাম লীগে’ পরিণত হয়েছে: হাসনাত আব্দুল্লাহ

অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্কয়ার গ্রুপে চাকরি, আবেদন শেষ ৭ আগস্ট

আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ চায় হুতিরা: ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টির আভাস

‘নাক টিপলে দুধ বের হয় পাটওয়ারীর, আবার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করে’

১০

দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে চান না ট্রাম্প

১১

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি ড. মোজাম্মেল হক

১২

ওয়াশিংটনে গেলেন নেতানিয়াহু

১৩

ইতিহাসের এই দিনে

১৪

আজকের নামাজের সময়সূচি

১৫

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার জায়গা নেই: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

১৬

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে নিয়োগ, সপ্তাহে ২দিন ছুটি

১৭

সিলেটে গ্যাস সিলিন্ডার গোডাউনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৩

১৮

হরমুজ প্রণালির জাহাজগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি, অভিযোগ ইরানের

১৯

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

২০
X