দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে চিত্র বদলালেও বহুল আলোচিত মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ব্যতিক্রম। রাজধানীর সবচেয়ে বড় এই ‘মাদকের বাজার’ রয়েছে স্বরূপে। বরং আগের চেয়ে আরও কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এখানকার মাদক কারবারিরা। এক মাস ধরে জেনেভা ক্যাম্পে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রায়ই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে মাদক কারবারিদের গ্রুপগুলো। এসব সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত দুজন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। তবে সংঘর্ষ বাড়লেও পুলিশ বলছে, এই মুহূর্তে তারা জেনেভা ক্যাম্পে বড় ধরনের অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৯০টি সেক্টরে ভাগ করা জেনেভা ক্যাম্পের ৩০টি সড়কেই রয়েছে মাদক বিক্রির ছোট-বড় স্পট। এসব স্পটে ২৪ ঘণ্টা চলে মাদক বিকিকিনি। আল ফালাহ মেডিকেলের গলিতে হেরোইন কিনতে প্রায়ই ক্রেতাদের লাইন লেগে থাকে। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ প্রতিদিন ক্যাম্পে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাদক বিক্রি হয়। মাদক ব্যবসা নিয়ে ক্যাম্পে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
কালবেলার হাতে সংঘর্ষের কয়েকটি ভিডিও এসেছে। এর একটিতে দেখা যায়, ক্যাম্পের গলির ভেতর পিস্তল হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যাচ্ছে এক যুবক। জানা গেছে, তার নাম চুয়া সেলিম। আরেকটি ভিডিওতে হেলমেট ও ভেস্ট পরে আরেক যুবককেও বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে দেখা যায়। তার আশপাশ থেকে আরও কয়েকজন প্রতিপক্ষের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছিল। স্থানীয়রা কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন, বন্দুক হাতে গুলি করা ব্যক্তির নাম কালিম জাম্বু। অন্য একটি ছবিতে কিলার আকরাম নামে একজনকে পিস্তল লোড করতে দেখা যায়। তারা প্রত্যেকেই কয়েক ডজন মাদক মামলার আসামি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারের মূলে ছিল চারটি গ্রুপ। এসব গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে পিচ্চি রাজা, চুয়া সেলিম, গালকাটা মনু ও ভূঁইয়া সোহেল। তবে ৫ আগস্টের পরে তারা দুটি গ্রুপে ভাগ হয়েছে। এর মধ্যে পিচ্চি রাজা ও ভূঁইয়া সোহেল মিলে হয়েছে একটি গ্রুপ। এই গ্রুপের প্রধান বশির মোল্লা; যিনি মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি। অন্যদিকে, চুয়া সেলিম ও গালকাটা মনু মিলে গঠিত হয়েছে আরেকটি গ্রুপ। গত ৫ আগস্ট মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার অস্ত্র লুটে জড়িত ছিল এই গ্রুপ। লুট করা পুলিশের সেই অস্ত্র হাতে মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে তারা সংঘর্ষে জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কামাল বিরিয়ানির বিরুদ্ধে ভূঁইয়া সোহেল গ্রুপ এবং বোবা বিরিয়ানির বিরুদ্ধে চুয়া সেলিম গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদক সম্রাট ইশতিয়াক এবং পঁচিশ মারা যাওয়ার পর ক্যাম্পের মাদকের পুরো নিয়ন্ত্রণ যায় বশির মোল্লা ও ভূঁইয়া সোহেলের হাতে। ভূঁইয়া সোহেলরা চার ভাই। বাকি তিনজন হলো রানা, রাজন কালো ও টুনটুন। তারা প্রত্যেকেই মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। ভূঁইয়া সোহেল গ্রুপের প্রধান ব্যবসা মূলত হেরোইন ও ইয়াবা। ক্যাম্পের ৫ ও ৭ নম্বর সেক্টরের মাঝের রাস্তায় আল ফালাহ মেডিকেলের গলিতে প্রকাশ্যেই চলে তার হেরোইনের ব্যবসা। দিনের বেশিরভাগই সময়ই এখানে হেরোইন ক্রেতার লাইন থাকে। তবে পরে ভিড় বাড়ে। লাইন ঠিক করতে রয়েছে নিজস্ব লাইনম্যান। লাইনে দাঁড় করিয়ে মাদক বিক্রির অন্তত পাঁচটি ভিডিও রয়েছে কালবেলার হাতে। এর একটিতে দেখা যায়, সাহিল ওরফে লম্বা সাঈদ ও তার বউ নূরী হেরোইন বিক্রি করছে। নূরী প্রথমে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা গুনে নেয়; এরপর সাইদ ক্রেতার হাতে হেরোইনের পুরিয়া তুলে দেয়। বাকি ভিডিওগুলোতেও একই কায়দার মাদক বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সরেজমিন ক্যাম্পের পাশের হুমায়ুন রোড ও বাবর রোডেও অন্তত ৭-৮টি স্পটে সড়কে দাঁড়িয়েই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করতে দেখা যায়। জানতে চাইলে ক্যাম্পের এক বাসিন্দা কালবেলাকে বলেন, ‘এটি এখানকার নিয়মিত দৃশ্য। প্রতিদিনই সন্ধ্যায় এখানে মাদক কেনার জন্য এভাবে সিরিয়াল লাগে। কেউ কথা বললেই তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়।’ তিনি আরও বলেন, এখানে মাদকের প্রধান গডফাদার ভূঁইয়া সেলিম ও তার তিন ভাই। তাদের মাদকই বিভিন্নজন বিক্রি করে। তারা অনেক প্রভাবশালী।
বশির মোল্লা মহাজির রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট (এমআরডিএম) নামে একটি সংগঠনের সভাপতি। ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণসহ সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এই সংগঠন। তবে সংগঠনের প্রধান বশির মোল্লা নিজেই মাদকের গডফাদার। খুচরা মাদক কারবারিদের পুলিশ ধরলে বশির নিজেই তাদের ছাড়াতে তদবির করেন। এ ছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রনের সঙ্গেও ছিল বশির মোল্লার গভীর সখ্য। কাউন্সিলরকে নিয়মিত মাসোহারা দিতেন। ক্যাম্পের বড় মাদক কারবারি গালকাটা মনু, পিচ্চি রাজা, চুয়া সেলিম, সৈয়দ পুরিয়া বম, ভূঁইয়া সোহেল ও তার তিন ভাই, বশিরের ভাগ্নে আজম ওরফে দুগলা আজম, নাদিম, ইমতিয়াজ, পাকিস্তানি রাজু ও পাপ্পু। এই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তুলে বশির মোল্লা তা পৌঁছে দিতেন কাউন্সিলর রাষ্ট্রনের বিশেষ সহকারী রেহানের কাছে। পিএসের হাত হয়ে সেই টাকা যেত কাউন্সিলরের পকেটে। আমির কালাম নামে এক ব্যক্তির ফার্মেসিতে বসে এসব টাকার লেনদেন ও হিসাবনিকাশ হতো। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে গা-ঢাকা দিয়েছেন কাউন্সিলর রাষ্ট্রন। ফলে এখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে ক্যাম্পের মাদক সিন্ডিকেট। যে কারণে টানা সংঘর্ষে নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছে ক্যাম্পের মাদক কারবারিরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্পটে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার হেরোইন এবং গাঁজা ও ফেনসিডিল বিক্রি হয় আরও অন্তত ১০ লাখ টাকার। পুরো রাজধানীর মাদকের হাব জেনেভা ক্যাম্প। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে এখানে মাদক এনে মজুত রাখা হয়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। ফোনে অর্ডার করলে মাদকের হোম ডেলিভারিও মেলে।
জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি ইফতেখার হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্র আগেও ছিল। তারা যে অস্ত্রগুলো নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে, সেগুলো পুলিশের অস্ত্র হতে পারে। আবার ওই অস্ত্র সিভিলিয়ানদের কাছেও থাকে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের থানা লুট হয়েছে, এই মুহূর্তে বড় পরিসরে অভিযান চালানোর জন্য আমরা ওয়েল প্রিপারেড না। তবে আমাদের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। খুব শিগগির ওখানে সেনাবাহিনীসহ সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।’