হাসান আজাদ
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৩:১৫ এএম
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৮:৩৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পর্যটন বিকাশে বাধা দুর্বল আইন-নীতি

সম্ভাবনা কাজে আসে না
পর্যটন বিকাশে বাধা দুর্বল আইন-নীতি

বৈচিত্র্যময় রূপের দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃতির নানা সৌন্দর্যের সঙ্গে ঋতুভেদে পার্থক্য দেখা যায় এ দেশের অঞ্চল, মাটি আর আবহাওয়ার। দেশজুড়ে পর্যটনে আকর্ষণীয় দেড় হাজারের মতো স্পট থাকার পরও বারবার হোঁচট খাচ্ছে এ খাত। দেশের ভেতরের পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ অবস্থায় পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল করতে ব্যবসার আইন ও নীতি সংস্কারের কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ট্যুর অপারেটর ও গাইডের জন্য আইন করা হয়েছে। এ আইনে বেশকিছু অসংগতি রয়েছে, যা পরিবর্তন করতে হবে। পর্যটন খাত বর্তমানে যে নীতির ওপর চলছে, এতে এ খাতে সুবিধার চেয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বেশি। আইন ও নীতির কারণে নতুন উদ্যোক্তারা এ খাতের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছেন। এজন্য জরুরিভাবে খাত সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি সংস্কার করে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।

এদিকে, এ খাতে আরও টেকসই উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। আগামী মাসে এ প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। এ সংস্কার প্রস্তাবে ব্যবসায়ীদের জন্য কর ব্যবস্থা সংস্কার, বিনিয়োগকারীদের সুযোগ-সুবিধা, সেবার মান নিয়ন্ত্রণসহ আরও অনেক বিষয় থাকবে বলে ট্যুরিজম বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ প্রেক্ষাপটে আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৪’ পালন করতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত এ বছরের প্রতিপাদ্য

‘পর্যটন শান্তির সোপান’। শান্তি বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় পর্যটন অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পর্যটনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের কালবেলাকে বলেন, পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল ও আকর্ষণীয় করতে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলে আমরা একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করছি। এতে আইন ও নীতি সংস্কার, বিনিয়োগ সুবিধা, সেবার মান নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়া থাকবে। তিনি বলেন, ২০২১ সালে ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড আইন প্রণয়ন করা হয়। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিধিমালা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ীরা কিন্তু আমাদের আইন সংস্কারের কথা বলেননি। আমাদের যদি বলতেন, তাহলে এতদিনে আইন ও নীতি সংস্কার করা যেত।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের শীর্ষ সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিওএবি) সভাপতি মো. রাফিউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশে পর্যটনের জন্য অনুকূল পরিবেশ নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা অসুবিধা রয়েছে। বর্তমানে পাহাড়কেন্দ্রিক পর্যটন বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে বিশ্বে কনিষ্ঠতম দেশ। অন্য দেশের পর্যটনের সঙ্গে বাংলাদেশকে মেলালে হবে না। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বলেছি আইন ও নীতি সংস্কার করতে। এ খাতকে গতিশীল করতে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া আমরা আমাদের পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে সঠিক মার্কেটিং করিনি, ব্র্যান্ডিং করতে পারিনি। এ খাতে সরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ নেই। বেসরকারি বিনিয়োগ ৯৫ শতাংশ। তাই বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকে সুরক্ষা দিতে হবে। সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। আমরা এরই মধ্যে এ খাতের ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা বলেছি।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড আইন-২০২৪ সম্প্রতি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে ট্যুর অপারেটরদের নিবন্ধন সংক্রান্ত নতুন কিছু নিয়ম ও শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, যা মেনে চলা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন। গেজেটে উল্লিখিত বিধিনিষেধ ও নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিধিমালায় দেখা গেছে, ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড (নিবন্ধন ও পরিচালনা) লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা নিবন্ধন সনদ ফি, ১০ লাখ টাকা ব্যাংক স্থিতির সার্টিফিকেট ও ৩ লাখ টাকা জামানত দিতে হবে, আবেদন ফি ৫ হাজার টাকা এবং সার্ভিস চার্জ ১ হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে, যা ট্যুর অপারেটরদের জন্য সম্ভবপর নয়। এতে ভবিষ্যতে দেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন।

এ ছাড়া পর্যটন শিল্পের স্বার্থে ট্যুর অপারেটরদের সেবার ওপর ভ্যাট বা মূসক আরোপ করা হয়েছে। এটা অন্যায়। কারণ ট্যুর অপারেটররা বিভিন্ন খাত থেকে পর্যটন উপাদান সংগ্রহ করে পর্যটকদের সুবিধা ও আরামদায়ক ভ্রমণে যে প্যাকেজ তৈরি করে, তার মধ্যেই মূসক অন্তর্ভুক্ত থাকে। এখন যদি পর্যটন উপাদান সম্মিলিত প্যাকেজে আবার নতুন করে মূসক দাবি করা হয়, কিংবা ট্যুর অপারেটর সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক ধার্য হলে ভ্রমণ খরচ অনেক বাড়বে। তাতে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পাশাপাশি নবায়ন ফি ও ব্যাংক স্থিতি কমানো এবং জামানত বাতিল, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে ইনবাউন্ড ট্যুরিজমকে রফতানি পণ্যের স্বীকৃতি, প্রণোদনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া; পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত সড়ক পরিবহন, নৌযান, আবাসন, বিভিন্ন সরঞ্জামে করমুক্ত/রেয়াত সুবিধা দেওয়া; ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরদের ব্যাংকিং চ্যানেলে সংগৃহীত বৈদেশিক মুদ্রা/রেমিট্যান্সের টোটাল বিলের ওপর ১০ শতাংশ অগ্রিম কর (এআইটি) কাটা বন্ধ করা; সারা বছর সুন্দরবনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল চালু রাখা; পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য পারমিশন গ্রহণ সহজ করা এবং টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বিকল্প পথ তৈরির কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, আপাতত এসব সংস্কার করলেই পর্যটন খাতে বিনিয়োগ আসবে এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

এ ছাড়া এই খাতে নিরাপত্তা একটা বড় বিষয়। ব্যবসায়ীরা জানান, সম্প্রতি কক্সবাজারে নারী পর্যটক লাঞ্ছিত হওয়া, মিরসরাইয়ে কয়েক পর্যটক ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার খবরে এ খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আরও জানান, দেশের অনেক পর্যটন স্পট আছে, যেখানে যাতায়াতের সমস্যা প্রকট ও খরচ বেশি। এ ধরনের স্পটগুলোতে যাতে করে সহজেই পর্যটকরা যেতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যাপ্ত পাবলিক বাথরুম, কাপড় পরিবর্তনের রুম, স্থানীয় পরিবহনের ভাড়া যৌক্তিকীকরণ, স্পটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।

ইচ্ছামতী ট্যুরিজমের কর্ণধার আবু নাসের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি চার বছর ধরে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডু এলাকার বিভিন্ন স্পটে পর্যটকদের নিয়ে যান। পেশায় তিনি এখন ছাত্র। ট্যুর অপারেটর হিসেবে নিজের কোম্পানিকে নিবন্ধন করতে গিয়ে দেখেন, অনেক টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ কারণে তিনি শুধু ট্রেড লাইসেন্স করে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ট্যুর অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স নিতে লাখ লাখ টাকা দিতে হবে। এটা আমার মতো ছোট অপারেটরের পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন এ খাতে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোডের গভর্নিং বডির সদস্য ও সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী পর্যটন খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে যে আইন আছে, সে আইনের মধ্য থেকে ব্যবসা করা বেশ কঠিন। আইনের কারণেই নতুন উদ্যোক্তা এ খাতে আসবে না। পর্যটন খাতকে অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে পাঁচ নম্বরে রাখা হলেও কার্যত এ খাতে সরকারের মনোযোগ কম। এ খাতকে আরও গতিশীল ও শিল্পে রূপান্তর করতে হলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে পুরো খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে, সংস্কার করতে হবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসের কর্মসূচি: আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, অধীন দপ্তর-সংস্থাসমূহ, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং অন্যান্য

সরকারি-বেসরকারি সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সকাল ৮টায় রাজধানীর আগারগাঁও পর্যটন ভবন থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সকাল ৯টায় পর্যটন ভবনের ‘শৈলপ্রপাত হলে’ দিবসের প্রতিপাদ্যে’র ওপর সেমিনার, হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে এ উপলক্ষে বিশেষ মূল্যছাড় ঘোষণা, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ‘লাইভ কুকিং শো’ আয়োজন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটে বিশেষ ছাড় এবং শিশুদের মধ্যে পর্যটনের সৌরভ ছড়িয়ে দিতে প্রতিটি জেলায় শিশুদের নিয়ে পর্যটনকেন্দ্রিক চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়েও উৎসবমুখর পরিবেশে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নামাজ শেষে বসে থাকা গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা

রাকসু নির্বাচনে সাইবার বুলিংরোধে ৫ সদস্যের কমিটি

১৮ মামলার আসামিকে কুপিয়ে হত্যা

নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় শঙ্কা দূর হয়েছে : যুবদল নেতা আমিন

আহত নুরের খোঁজ নিলেন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণে ৩১ দফার বিকল্প নেই : লায়ন ফারুক 

চবির নারী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

অবশেষে জয়ের দেখা পেল ম্যানইউ

আ.লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

আসিফের ঝড়ো ইনিংসও পাকিস্তানের জয় থামাতে পারল না

১০

খুলনায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১৫

১১

বাবা-মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত ভাইরাল, মুগ্ধ নেটিজেনরা

১২

ডাচদের বিপক্ষে জয়ে যে রেকর্ড গড়ল লিটনরা

১৩

সাকিবের রেকর্ডে ভাগ বসালেন লিটন

১৪

বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নতুন কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগ

১৫

জয়ের কৃতিত্ব কাদের দিলেন লিটন?

১৬

চায়ের দোকানে আ.লীগ নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৭

ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে যা বললেন তাসকিন

১৮

বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে জাপা অফিসে ভাঙচুর

১৯

প্রতিটি জেলা থেকে ট্যালেন্ট হান্ট চালু করবে বিএনপি : আমিনুল হক 

২০
X