দেশের প্রচলিত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বিদেশিদের কাছে উচ্চমূল্যে শেয়ার হস্তান্তর করেছে দেশের অন্যতম চাকরি সংক্রান্ত ওয়েবসাইট বিডি জবস ডটকম। বিদেশিদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া এই শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স পরিশোধ হয়েছে কি না, তা জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন বিডি জবস কর্তৃপক্ষ। তবে কাকতালীয়ভাবে দেশের চারটি জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে এসব শেয়ার হস্তান্তর করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার হস্তান্তরে দফায় দফায় আইন ভঙ্গ করেছে বিডি জবস। প্রতিষ্ঠানটি বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে এসে অর্থাৎ ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর সাতজন বাংলাদেশি আমেরিকান নাগরিক ফয়সাল আহসান চৌধুরীর কাছে দশ হাজার ৭৫০টি শেয়ার হস্তান্তর করেন।
পরে ২০১৪ সালের মার্চে একই আমেরিকান নাগরিক ফয়সাল আহসান চৌধুরী সিক ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ ইউএ নেদারল্যান্ডসের কাছে ৩৭ হাজার ৫৪টি শেয়ার হস্তান্তর করেন। আরেকটি নির্বাচনী বছর ২০১৮ সালের ৯ মার্চে আমেরিকান নাগরিক ফয়সাল আহসান চৌধুরী সিক ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পিটি লিমিটেড অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১৬ হাজার ৬৬২ শেয়ার হস্তান্তর করেন।
দেশের সর্বশেষ নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি এই আমেরিকান ফয়সাল আহসান চৌধুরী ও সিক ইন্টারন্যাশনাল নেদারল্যান্ডস অস্ট্রেলিয়ার সিক ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পিটি লিমিটেডের কাছে ৬০ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮০টি শেয়ার হস্তান্তর করেছে। অনাবাসী নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার হস্তান্তরে দেশের প্রচলিত আইনকে আমলেই নেয়নি বিডি জবস। প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করলেও জানে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানা ধরনের অসংগতি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে গেইন ট্যাক্স ও ফান্ড ট্রান্সফার ফির বিষয়ে কোম্পানির কাছে তথ্য চাইলেও তা দিতে পারেনি বিডি জবস লিমিটেড।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বিডি জবস শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অবহিত বা জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানেনি। বিষয়টি সুস্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার কারও নামে ইস্যু হলে শেয়ার ভ্যালু ও দাম এক থাকবে, এক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশিদের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের গেইন ট্যাক্স পরিশোধ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এনবিআর সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রায় সম্পাদিত চুক্তি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোধগম্য নয় বলেও বলা হয়েছে। আর পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠান কোনো চুক্তি করলে স্থানীয় মুদ্রায় চুক্তি করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া বিডি জবসের ভ্যালুয়ার প্রতিষ্ঠান নুরুল ফারুক হাসান অ্যান্ড কোং-এর ভ্যালুয়েশন যথাযথ গাইড লাইন মেনে হয়নি। যার কারণে ভ্যালুয়েশনকারী কোম্পানিকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর বিডি জবসের শেয়ার এক অনাবাসী থেকে আরেক অনাবাসী উচ্চমূল্যে হস্তান্তর করেছে। আর ভবিষ্যতে বিষয়টি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে গেইন ট্যাক্সের বিষয়ে দলিলাদি চাইলে বিডি জবস তা, দেখাতে পারেনি বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই বিডি জবসের পরবর্তী শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়েবসাইট বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত ইস্যু নিষ্পত্তি হয়েছে বলে কালবেলার কাছে দাবি করেন। বেসিসের সাবেক এই সভাপতি বলেন, শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়টি গত সপ্তাহে নিষ্পত্তি হয়েছে। এখানে আমরা ব্যাংককে অবহিত না করা এবং ফান্ড ট্রান্সফারের ইস্যু ছিল। কিন্তু এখানে কোনো গেইন ট্যাক্সের বিষয় ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে বলেও দাবি করেন। তার কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্স কপি রয়েছে বলেও দাবি করেন। তবে তার কাছ থেকে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য আর এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থেকে গত সপ্তাহেই কর পরিশোধ হয়েছে কি না তা এনবিআরের কাছে জানতে চেয়েছে।