

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নবীন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এ দলটি আসন সমঝোতায় পেয়েছে ৩০টি আসন। পাশাপাশি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় আরও দুটি আসনে এনসিপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে মোট ৩২টি আসনে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকছে দলটি। দল হিসেবে নবীন হলেও এনসিপি এবারের নির্বাচনকে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। দলটির প্রত্যাশা, গণঅভ্যুত্থানের একাধিক পরিচিত ও আলোচিত মুখ এবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন।
এনসিপি থেকে কারা সংসদে যাওয়ার টিকিট পাচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে আগ্রহ। দলটির ভেতরেও চলছে নিবিড় আলোচনা ও জরিপ। কোন আসনে কারা এগিয়ে, কাদের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি, তা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত ১০টি আসনে দলটির হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছেন, যাদের ঘিরেই বড় স্বপ্ন দেখছে এনসিপি। পাশাপাশি আরও কয়েকজন প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন বলেও প্রত্যাশা তাদের।
আলোচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকায় তিন প্রার্থীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে এনসিপি। তারা হলেন ঢাকা-১১ আসনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-৮ আসনে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা–১৮ আসনে আরিফুল ইসলাম আদীব। এসব আসনে ১০ দলীয় জোট থেকে তাদের জয়ী করে আনতে সবাই বদ্ধপরিকর বলে জানা গেছে। ঢাকা-৮, ঢাকা-১১ এবং ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী যথাক্রমে মির্জা আব্বাস, ড. এম এ কাইয়ুম ও এস এম জাহাঙ্গীর। তারা তিনজনেই হেভিওয়েট এবং জনপ্রিয় প্রার্থী। এসব আসনে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও এনসিপি জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
বিভিন্ন জরিপ ও সমীকরণে ঢাকার বাইরে সাতজন প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছে এনসিপি। তারা হলেন রংপুর-৪ আসনে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, কুমিল্লা-৪ আসনে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, পঞ্চগড়-১ আসনে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, নোয়াখালী-৬ আসনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আবদুল্লাহ আল আমিন, কুড়িগ্রাম-২ আসনে আতিকুর রহমান মুজাহিদ (আতিক মুজাহিদ), দিনাজপুর-৫ আসনে ডা. আবদুল আহাদ। এসব আসনে জয়ের প্রত্যাশা করছে এনসিপি সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনে ঋণখেলাপির অভিযোগে মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর রিট সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলমের বিরুদ্ধে লড়বেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নওশাদ জমির। এ আসনে সারজিসকে বেশ চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। তবুও এ আসন ঘিরে স্বপ্ন দেখছে এনসিপি।
এ ছাড়া ঢাকা-২০ আসনে নাবিলা তাসনিদ, নরসিংদী-২ আসনে সারোয়ার তুষার, টাঙ্গাইল-৩ আসনে সাইফুল্লাহ হায়দার, পিরোজপুর-৩ আসনে শামীম হামিদী, মৌলভীবাজার-৪ আসনে প্রীতম দাস, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে মোহাম্মদ আতাউল্লাহ, নাটোর-৩ আসনে এস এম জার্জিস কাদির, চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোবাইরুল হাসান আরিফসহ কয়েকজন প্রার্থীও ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে নরসিংদী-২ আসনে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জামায়াতের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় বিপাকে পড়েছেন এনসিপির প্রার্থী।
এনসিপির একাধিক নেতা কালবেলাকে বলেন, ৮ থেকে ১০ জন এনসিপি প্রার্থী জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিভিন্ন জরিপেও তারা এগিয়ে আছেন। এর বাইরেও চার থেকে পাঁচজন ভালো লড়াই করবেন এবং জয়ীও হতে পারেন। এ ছাড়া উচ্চকক্ষ এবং সংরক্ষিত নারী আসনেও এনসিপির কয়েকজন সংসদে যাবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, আমরা সর্বস্তরের জনগণ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। এ ছাড়া জোট থেকে সব দলেই সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী এলাকায় সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ বজায় আছে। আশা করি ভালো ফল পাব।
যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, জয়ের ব্যাপারে আমি খুবই আশাবাদী। জামায়াতসহ সবাই আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। ভোটের পরিবেশও ভালো। এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীও বিতর্কিত এবং তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। সবমিলিয়ে আশা করি ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচিত হব।
গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রাশেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এ তরুণরাই রাজপথে থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মূল আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছে। তাদের সংসদে অন্তর্ভুক্তি হলে কেবল প্রজন্মগত ভারসাম্যই আসবে না, বরং নীতিনির্ধারণে গণআন্দোলনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটবে।’ তিনি বলেন, ‘তরুণ নেতৃত্বকে বাইরে রেখে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত টেকসই হতে পারে না।’
এনসিপির ৬ আসনে জোটের অন্য প্রার্থী : ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা এনসিপিকে ৩০টি আসন ছাড়লেও এর নরসিংদী-২ আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আমজাদ হোসাইন। সিরাজগঞ্জ-৬, নারায়ণগঞ্জ-৪, ঢাকা-২০ এবং রাজবাড়ী-২ থেকে অন্য দুটি শরিক দলের প্রার্থীরাও মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। এ ছাড়া ১০ দলীয় ঐক্য মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা) আসনটি উন্মুক্ত রেখেছে। এখানে এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ নূরে আলম হামিদী নির্বাচন করবেন।
এনসিপির দুজন প্রার্থীও জোটভুক্ত দলকে ছেড়ে দেওয়া দুটি আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। আসন দুটি হলো শরীয়তপুর-১ ও শেরপুর-১। এ বিষয়ে এনসিপির দায়িত্বশীল একজন নেতার ভাষ্য, দলের প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে যেতে পারেননি। পরে তারা গেলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারেননি। শরীয়তপুর-১ আসনের প্রার্থী আব্দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারিনি। তবে আমি নির্বাচন করব না, জোটের পক্ষে কাজ করব।’
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপির প্রার্থী আল আমিন কালবেলাকে বলেন, ‘জোটগতভাবে এই আসন আমাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনয়ন প্রত্যাহার করেনি। বাকি দলগুলো আমার সঙ্গেই আছে। জোটের সিদ্ধান্তকে সবার সম্মান জানানো উচিত।’
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বলেন, ‘ছেড়ে দেওয়া আসনেও প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করার বিষয়টি নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আলোচনা করা হচ্ছে। আলোচনায় একটি সমাধান আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’
ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে নির্বাচনী প্রচার : এনসিপির নির্বাচনী প্রচার আজ বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। সকাল সাড়ে ১০টায় তিন নেতার মাজার ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে এই প্রচার শুরু হবে। কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আরিফুল ইসলাম আদীব, মনিরা শারমিন, জাবেদ রাসিন, দিলশানা পারুল, নাবিলা তাসনিদসহ দলের অন্য নেতারা।
মন্তব্য করুন