বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৯ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ১০:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

‘ওগো পোড়াইয়া দেয় না কেন’

নাশকতার আগুন
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন নাশকতার আগুনে দগ্ধ একজন। ছবি: কালবেলা
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন নাশকতার আগুনে দগ্ধ একজন। ছবি: কালবেলা

‘আমি তো হরতাল-অবরোধ বুঝি না, রিকশা চালাইয়া খাই। আমারে আগুন দিয়া পোড়ালে কেন? ১০ দিন ধইরে রিকশা চালাইতে পারি না। হাসপাতালে শুয়ে আছি। সংসার চলছে না, পোলা-মাইয়া না খেয়ে আছে।’ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের শয্যায় শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন আবদুল জব্বার।

মুখমণ্ডলের পোড়া ক্ষত শুকালেও তার দুই হাতে পোড়া দগদগে ঘা। দুই পা সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। বিএনপির ডাকা চতুর্থ দফা অবরোধের আগে গত ১১ নভেম্বর রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অনাবিল পরিবহনের বাসে দেওয়া আগুনে দগ্ধ হন তিনিসহ কয়েক যাত্রী। এরপর থেকে হাসপাতালের বিছানায় পোড়া যন্ত্রণায় ছটফট করছেন এ রিকশাচালক।

জব্বারের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা জানান, হরতাল-অবরোধ হওয়ায় তার স্বামী সেদিন রিকশা গ্যারেজে রেখে নারায়ণগঞ্জে ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন। এর পরও রক্ষা হয়নি। তারা নীলফামারীর জলঢাকায় গ্রামের বাড়ি থাকেন। স্বামীর এমন খবর পেয়ে ঋণ করে ভাড়ার টাকা জুগিয়ে ঢাকায় এসেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বার্ন ইনস্টিটিউটের ৫২০ নম্বর ওয়ার্ডের ২৫ নম্বর শয্যায় তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন বোঝা গেল জব্বার রাজনীতি করেন না, বোঝেনও না। তার আক্ষেপটাও সেখানেই। নিজের পোড়া যন্ত্রণা ভুলে তার তিন শিশু ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ভবিষ্যতে চলবেন কীভাবে—সেই চিন্তাই তাকে বেশি কাতর করে দিচ্ছিল। কিছুটা ক্ষোভও ঝরল তার কণ্ঠে, বললেন, ‘সরকার ওগো পোড়াইয়া দেয় না কেন? তাইলে বুঝবে পোড়া যন্ত্রণা কত অসহ্য।’

শুধু জব্বার নন, গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। পরে তা হরতাল-অবরোধেও চলতে থাকে। এই ভয়ংকর নাশকতায় এরই মধ্যে অগ্নিদগ্ধ হয়ে দুজন পরিবহন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দগ্ধ হয়েছেন অনেকে। দেখা যায়, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গতকাল পর্যন্ত সাতজন পোড়া যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

ওই সাতজনের একজন রবিউল ইসলাম রবি (১৮)। পেশায় বাসের হেলপার। ২৯ অক্টোবর রাতে ‘অসীম পরিবহনের’ বাসটি ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় রেখে আরেক সহকর্মী নাঈমকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। গভীর রাতে সেটিতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় দগ্ধ হন দুজন। চোখের সামনেই ছটফট করে মারা যান সহকর্মী নাঈম। শরীরে আগুন নিয়েই বাসের জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণ রক্ষা হলেও ২২ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।

গতকাল রবিউলের সঙ্গে কথা বলার সময় থরথর করে কাঁপছিলেন। জানালেন, সেই রাতের কথা এখনো ভুলতে পারেননি। ‘আমাগো দোষ কী? আমরা তো কাম করে খাই। আমাগো আগুন দেয় কেন?’—বলতে বলতে রবিউলের চোখ বেয়ে পানি বেরিয়ে আসে। সেই পানি দগ্ধ মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে পোড়া ঘা আরও দগদগ করে।

বাসের হেলপার রবিউলের ছোট্ট প্রশ্নগুলোর জবাব না মিললেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মানিক দাশ বুঝতেই পারছেন না, তাকে কেন দগ্ধ হতে হয়েছে। রবিউলের পাশের শয্যায় চিকিৎসাধীন মানিক জানান, ১২ নভেম্বর ডিউটি শেষে রাতে এয়ারলাইন্সের বাসেই ফিরছিলেন হাজারীবাগের বাসায়। বাসটি বনানীতে যেতেই পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। এতে তার মতো কয়েক কর্মী দগ্ধ হলেও তারটা গুরুতর।

মানিক জানান, তার একটিমাত্র মেয়ে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী পিংকি সরকার হাসপাতালে তার শয্যা পাশে থাকায় মেয়েটি বাসায় একা থাকে। বাবার এ অবস্থায় সে বার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারছে না।

মাহমুদ হাসান নারায়ণগঞ্জে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ১১ নভেম্বর সেখান থেকে ঢাকায় এসেছিলেন শখের মোবাইল ফোন কিনতে। ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অনাবিল পরিবহনের বাসে দেওয়া আগুনে দগ্ধ হন তিনি। মাহমুদ জানান, তার চাকরির টাকায় সংসার চলে। কিন্তু ১০ দিন ধরে হাসপাতালে। চাকরি টিকবে কি না, বুঝতে পারছেন না।

ওই তিনজনের মতো বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৮ অক্টোবর রাজধানীর কাকরাইলে দগ্ধ হওয়া মো. শাখাওয়াত, ৫ নভেম্বর মেরাদিয়ায় দগ্ধ হওয়া মো. সবুজ, ১২ নভেম্বর যাত্রাবাড়ীতে দগ্ধ হওয়া বিপ্রজিত দাশ এবং মো. হাসান।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন দৈনিক কালবেলাকে বলেন, গত ২৮ অক্টোবরের পর সাত রোগী দগ্ধ হয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাদের সবার বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছর। তারা সবাই কর্মক্ষম মানুষ। পেট্রোল বোমা কিংবা বাসের মধ্যে আগুনের তীব্রতা খুব বেশি হয়। তাদের শরীরের ভেতরের চামড়াও পুড়ে গেছে। এজন্য এসব রোগীকে অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। অনেকের অস্ত্রোপচারও করতে হবে। প্রায় সবার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। তাদের কেউ শঙ্কামুক্ত নন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চশমা সাইদের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

তিন ঘণ্টা পর চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ শুরু

মানহানি মামলা করলেন এনসিপি নেত্রী

ময়মনসিংহে ট্রেনের তিন বগি লাইনচ্যুত

ইতালির ১৫টি শহরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি

জবি ছাত্রদলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে চিকিৎসক লাঞ্ছনার অভিযোগ

‘আ.লীগের জায়গা আছে, বিএনপি-জামায়াতের যাওয়ার জায়গা নেই’

ডা. জুবাইদা রহমানের ৫৫তম জন্মদিন উপলক্ষে ঢামেকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

ধানমন্ডিতে সাংবাদিককে মারধর : জামায়াতের চার কর্মী বহিষ্কার

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত মৃদুল, দাবি পরিবারের

১০

বৃহস্পতিবার টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

১১

আজ গোল করলেই পেলের রেকর্ডে ভাগ বসাবেন নেইমার

১২

শাহজালাল বিমানবন্দরে আনসারদের তৎপরতায় প্রবাসীর হারিয়ে যাওয়া লাগেজ উদ্ধার

১৩

খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় মোদিকে ইরানের আমন্ত্রণ

১৪

বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই তিস্তার পানি, প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল

১৫

বিএমইউর ৫৩৯ রেসিডেন্টকে থিসিস গ্র্যান্ট প্রদান

১৬

বিশ্বকাপ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে!

১৭

‘ফাইনাল পর্যন্ত’ আর্জেন্টিনার সূচি জানা গেল, শেষ বত্রিশে প্রতিপক্ষ কারা

১৮

আওয়ামী লীগ থেকে ইউপি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

১৯

উপদেষ্টা জাহেদ ইস্যুতে ভারতের ব্যাখ্যা ‘সন্তোষজনক নয়’ : ঢাকা

২০
X