ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৪৫ এএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:০৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাক্ষাৎকার

অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের ফল ছাত্র-জনতার আন্দোলন

অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের ফল ছাত্র-জনতার আন্দোলন

যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটিতে উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক (ভিজিটিং)। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া (২০১৪-২২) ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে (২০২২-২৪) অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি প্রফেসরিয়াল ফেলো। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতির সংস্কারসহ নানা বিষয় নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন

ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে কর্তৃত্ববাদী একটি সরকারের পতন ঘটেছে এবং নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই গণআন্দোলন বা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণ কী বলে মনে করেন?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: সাধারণত একটি সরকারের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে আন্দোলন শুরু হয় অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে। তবে অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটা খুব দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়। আমরা দেখেছি এই আন্দোলনের আগে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এই সময়ে মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধনী ও গরিবের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে সুযোগের অভাব, লাগামহীন দুর্নীতি ও সীমাহীন লুটপাটের মধ্যে। এসবকিছুর প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া মানুষের সম্মিলিত ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো এবারের ছাত্র-জনতার বিপ্লব। এই বিপ্লব সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের দাবির পাশাপাশি গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।

এই গণঅভ্যুত্থানের সুদূরপ্রসারী কী প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এটা নিশ্চয়ই একটি বড় সম্ভাবনা যে, আমাদের চারপাশ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আওয়াজ উঠছে। আমাদের সৌভাগ্য যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পেয়েছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই গণঅভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করেছেন স্বাধীনতা ২.০ হিসেবে। আমরা আরেকবার সুযোগ পেয়েছি স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন সমাজে নিজেদের তৈরি করার। কারণ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩ বছর পরও স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। আমরা বাকস্বাধীনতা পাইনি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাইনি, যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পাওয়া এবং জীবনে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতাটুকু পাইনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। দেশের সব ধর্মের, বর্ণের, গোত্রের এবং সব অর্থনৈতিক অবস্থানের মানুষের কাছে স্বাধীনতার স্বাদ পৌঁছে দিতে হলে মৌলিক কিছু পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তনটি শুধু প্রশাসন এবং রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের অন্যান্য খাত এবং ক্ষেত্রেও সেই সংস্কারটি প্রয়োজন।

আমার কাছে এই স্বাধীনতা থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো—আমরা আজ জাতি হিসেবে সম্মিলিতভাবে মন খুলে সংস্কারের আলাপ তুলছি। আমরা নির্দ্বিধায় সব ধরনের সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করছি। এটা আমাদের নতুন বাংলাদেশের হাতছানি দিচ্ছে।

’৯১ সালে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন হয়েছিল। সে সময়ও অনেক সংস্কারের কথা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সংস্কারগুলো আমরা আর দেখিনি। সেই পরিস্থিতিতে যাতে ফিরে না যেতে হয়, তার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয় কী?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: আমি প্রথমেই একটু সংশোধন করে দিতে চাই যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে আন্দোলনটি হয়েছে, সেটি ১৯৯১ সালে সংঘটিত স্বৈরাচারী এরশাদ পতনের আন্দোলনের মতো নয়। দুটি আন্দোলন সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের এবং ভিন্ন প্রেক্ষিতের। এই আন্দোলনের সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো—আন্দোলনের সূচনা করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশের তরুণ সমাজ। তারা আন্দোলনটি শুরু করে মাঠ থেকে সরে যায়নি। স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে তারা কারও হাতে ক্ষমতা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। বরং আন্দোলনটি সফল হওয়ার জন্য যা যা করার প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে তারা সমাজের রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে মিলে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এটা আমাদের বিরাট আসার সঞ্চার করে।

অনেকে একটি শব্দ বলছেন ‘ইউথ কোয়েক’ অর্থাৎ তরুণদের ঝটকা। আমরা এখন এই তরুণদের ঝটকা দেখছি। আমরা লাতিন আমেরিকায় দেখেছি, শ্রীলঙ্কায় দেখেছি এবং এখন বাংলাদেশে দেখছি। এসব জায়গায় তরুণরা সমাজ পরিবর্তনের সূত্রপাত করে সরে যায়নি। বরং পরিবর্তন যাতে টেকসই হয়, তার জন্য তারা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করছে। এটা আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া। আমি আশা করতে পারি, নিকট ভবিষ্যতে আমাদের সামনে একটি বড় মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনটি হবে ইতিবাচক, যা আমাদের আর ১৯৯১ বা ২০০৮ সালের মতো ব্যর্থ করবে না।

সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারে ছাত্রদের কীভাবে যুক্ত করা যেতে পারে?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: প্রথমত, এবারের আন্দোলনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল সেই প্রত্যাশা অনুসারেই ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদের রাষ্ট্র পরিচালনায় জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এটাকে বলি ইনক্লুসিভ লিডারশিপ। আমি মনে করি, এটা একটি মৌলিক পরিবর্তন। তবে অনেকেই এটাকে অনেকভাবেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখছেন। তবে আমি মনে করি, ছাত্রদের একটি টেকসই নেতৃত্ব দানের অবকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোতে ছাত্রদের ওয়াচ ডগ হিসেবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। যাতে ভবিষ্যতে যেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসুক না কেন, সেখানে ছাত্রদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়।

আমরা ইতোমধ্যে ডক্টর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুজন ছাত্র উপদেষ্টা পেয়েছি। প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সহকারী হিসেবে আরও একজন ছাত্রনেতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স মেকানিজম সৃষ্টিতে ছাত্রদের কাজে লাগানো

হচ্ছে। পাশাপাশি ছাত্রদের সরকারের উপদেষ্টা পদের মতো জায়গায় বসানো কতটুকু টেকসই, তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, সেটা চলতে থাকুক। এটা একটি মুক্ত বাংলাদেশ, এখানে যে কারও মতপ্রকাশের এবং সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। ফলে এই বিতর্ককে একপাশে রেখেই আমরা আগামীর বাংলাদেশের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছাত্রদের একটি সুনির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া নিয়ে কথা বলতে পারি। ছাত্রদের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে সংযুক্ত করলে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে যে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা হয়, তার বিরুদ্ধে একটি কার্যকরী চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স মেকানিজম তৈরি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

কোনো দেশে এরকম একটি বিপ্লবের পর ছাত্রদের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে সংযুক্ত করার কোনো উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে কি?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: আমরা বাংলাদেশে এবার যে ছাত্র-জনতার বিপ্লব দেখেছি, তার যে রূপ এবং প্রেক্ষিত, তা অনেকটাই ইউনিক। একুশ শতকে পৃথিবীতে এটাই প্রথম কোনো সফল বিপ্লব, যেটা তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে। তাই আমরা তেমন কোনো উদাহরণ খুঁজে পাব না। তবে অনেক দেশেই ছাত্র নেতৃত্ব থেকে সরকারে মন্ত্রী হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। অর্থাৎ তারা ছাত্র অবস্থাতেই সরকারে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই বাংলাদেশে ছাত্র নেতৃত্বের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণকে আমি অস্বাভাবিক মনে করি না। তাদের একাডেমিক শিক্ষার দিক থেকেও এটাকে আমি সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখি না।

তবে ছাত্র অবস্থায় পড়াশোনা পাশে রেখে শুধু রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকা শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অবশ্যই এটা নিয়ে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারত্বের স্বপ্ন নাগরিক হিসেবে একজন তরুণ দেখতেই পারে। তবে এটা ভুললে চলবে না যে, এখানে একটি পেশাদারিত্বের ব্যাপার রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিতদের একটি পদ্ধতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে একটি দায়িত্বে বসতে হয়। ফলে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান নয়; বরং নানা ধাপে অনেক কিছু শিখতে হয়, অনেক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। আজ একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশের ছাত্র প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চলে আসতে হয়েছে। কিন্তু এটা যেন ভবিষ্যতে এমন হয়ে না দাঁড়ায় যে, শিক্ষাকে একপাশে রেখে রাজনীতিতে পদার্পণই ছাত্রদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম, অবহেলা ও দুর্যোগের ফলে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের অনীহা ও অনাস্থা চলে এসেছে। আর এর ফলেই আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখছি। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, বর্তমান সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়, দেশের কোনো মৌলিক সংস্কার আনা সম্ভব নয়। আর সেই অনাস্থার কারণেই অনেকে মনে করছে, শিক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে এখনই রাষ্ট্রের হাল ধরতে হবে। তারা মনে করছে, এই সুযোগ নিয়ে তারা রাষ্ট্রের সব অনিয়ম দূর করবে ও ঘাটতি পূরণ করবে।

আমরা এটি বিপ্লবের প্রথম ধাপ পার হয়ে একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন আমাদের প্রয়োজন একটু সহিষ্ণুতা। শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এই দুই ভিত্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত হতে হবে। সেখানে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং শিক্ষার মধ্যে থেকেই শিক্ষার্থীদের সমাজ এবং রাজনীতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হবে।

সরকার পতনের পরপরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্থিরতা দেখছি। শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বা ক্ষেত্রবিশেষে অন্যান্য শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে। এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: ছাত্রছাত্রীরা অভিভাবকশূন্য। গত ১৫ বছরে যেভাবে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয়করণ হয়েছে, তা ন্যক্কারজনক। যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা ও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফলে তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এর ফলেই সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। আমাদের সামনে এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো এই নেতৃত্ব শূন্যতার অবসান ঘটানো এবং দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা।

শিক্ষার্থীরা হয়তো ভাবছে, তারা যদি শিক্ষালয়ে ফেরত যায়, তাহলে তারা যে সুযোগটি জাতির সামনে এনে দিয়েছে, সেটা কি হাতছাড়া হয়ে যাবে? স্বপ্ন কী অপূর্ণই থেকে যাবে? পাশাপাশি তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছে যে, এটা কি একটি পরিবর্তনশীল শিক্ষাব্যবস্থা হবে নাকি আগের মতোই একটি ভঙ্গুর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয় এমন হয়ে গিয়েছিল যে, এখানে আমরা শিক্ষা ছাড়া আর সবকিছু নিয়েই আলোচনা করি, এখানে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি হয় এবং ছাত্রছাত্রীদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কোনো প্রতিফলন থাকে না। দ্রুত ছাত্রছাত্রীদের এই অনিশ্চয়তা থেকে বের করতে হবে এবং তাদের ক্লাসে ফেরাতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে আপনার পরামর্শ কী?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শিক্ষা উপদেষ্টা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নতুন চালু করা কারিকুলাম বাদ দিয়ে পুরোনো কারিকুলামে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন। নতুন যে কারিকুলাম চালু করা হয়েছিল, সেটা কোনো গণতান্ত্রিক পথ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়নি। শিক্ষক, অভিভাবক, গবেষক, ছাত্রছাত্রী এবং সুশীল সমাজ কারও মতামত নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ এক অর্থে বলা যায়, এটা ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে কোনো জনসম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে এই কারিকুলাম চালুর পরে সর্বস্তরে প্রতিবাদ উঠছে। অভিভাবকরা অখুশি, শিক্ষকরা বুঝছেন না কীভাবে এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং যেসব পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে, সেখানে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা। সবকিছু মিলিয়ে একটি হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছিল। নতুন কারিকুলামের প্রতি কেউই আস্থা রাখতে পারছিলেন না। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কারিকুলাম বাতিল করে আগের কারিকুলামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা যৌক্তিক।

এবারের ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে। আমরা জানি, দেশে বেকারত্বের হার অনেক বেশি এবং প্রতি বছর নতুন করে অনেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: মূলত দুটি দিক থেকে এই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। একটি হলো সামষ্টিক অর্থনীতি: মূলত আমাদের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণেই এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। দেশে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেটা হয়েছে কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি। আমরা অর্থনীতির নিয়মে বলে থাকি দেশে প্রবৃদ্ধি হলে সেটা জনগণের কাছে অনেক ধরনের সুবিধা নিয়ে যাবে। আর এর মধ্যে অন্যতম সুবিধা হলো ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা সেটা একদমই দেখিনি। বরং আমরা বাংলাদেশে দেখেছি উল্টোটা। ২০১০ সালের পর বাংলাদেশে কর্মসংস্থান আরও কমেছে।

এই মুহূর্তে যদি আমরা বেকারত্বের সমস্যার সমাধান করতে চাই, তাহলে নতুন করে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এটা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাড়াতে হবে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। এটা করতে পারলে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকার যদি অ্যাক্টিভ লেবার মার্কেট পলিসি গ্রহণ করতে পারে, তাহলেও বেকার সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। সরকার আরও একটি কাজ করতে পারে। যারা বেকারত্বের মধ্যে রয়েছেন তাদের বীমার মধ্য দিয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারে। যাতে তারা অতি দারিদ্র্যের মধ্যে না পড়েন। এটা মূলত সামাজিক সুরক্ষা অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে হতে পারে।

চাকরির অভাব আমাদের তরুণদের ব্যাপকভাবে হতাশ করেছে। এই হতাশা তাদের এই আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছে। শিক্ষিত তরুণরা উপেক্ষিত হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব থাকার কথা, সেটি রাষ্ট্র পালন করেনি। তরুণরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত এই মুহূর্তে তরুণদের বোঝানো যে, আমরা তোমাদের নিয়ে ভাবছি এবং আমরা তোমাদের প্রয়োজনগুলো পূরণের দায়িত্ব নিচ্ছি।

দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কী কী সংস্কার প্রয়োজন?

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীলতা নিয়ে আসাই সব থেকে বড় কাজ। শুধু দ্রব্যমূল্য কমানো নয়; বরং দেশের অর্থনীতির ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। যদি সরকার জনগণের সামনে একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা তুলে ধরে যে, আমরা এভাবে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেব, তাহলে মানুষের আস্থার জায়গাটিতে বড় অগ্রগতি হতে পারে।

দেশের অর্থনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার, সেটা হলো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসা। গত ১৫ বছরে এই নিয়ন্ত্রণটি হারিয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক সুশাসনের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন থাকার কথা, সেগুলোয় ব্যাপকভাবে রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্বভাবে কাজ করার স্বাধীনতা হারিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ভালো পদক্ষেপ দেখেছি। একই ধারায় আরও সংস্কার প্রত্যাশা করি।

মানুষকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, আগামীদিনে অর্থনীতিতে আর কোনো বড় অনিয়ম হবে না। রাষ্ট্র থেকে যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে সেগুলো নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকেই নেওয়া হবে। কোনো রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দেশের অর্থনীতিকে অপব্যবহার করা হবে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে যোগ দিতে বাধা

এক্সপ্রেসওয়েতে ৪ বাসের সংঘর্ষ

নিয়ম পরিবর্তন করে নির্বাচন দেন, আপত্তি থাকবে না : হাসনাত

তিন দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের মহাসমাবেশ চলছে

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যেমন হতে পারে বাংলাদেশের একাদশ

নাক ও চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে নুরের, মেডিকেল বোর্ড গঠন

মানুষ ঘুমের মধ্যে কেন হাসে, কী করণীয়

জাপার কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সতর্ক অবস্থান

শাহ পরাণের মাজারে শিরনি বন্ধ হবে, দরবার ভাঙবে : মেঘমল্লার বসু

বাড়ি বেচে দিলেন সোনু সুদ

১০

বাইচের নৌকা ডুবে নিহত ২

১১

মার্কিন আদালতে ট্রাম্পের বেশিরভাগ শুল্ক অবৈধ ঘোষিত

১২

বায়ুদূষণে চ্যাম্পিয়ন কামপালা, ঢাকার অবস্থান কত

১৩

সব সময় ক্লান্ত লাগার ৫ সাধারণ কারণ

১৪

পরীক্ষামূলকভাবে আজ শুরু স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল

১৫

ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে তুরস্ক

১৬

দেশে কত দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে আজ

১৭

সারা দেশে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ আজ

১৮

রাজনীতি ছেড়ে অভিনয়ে ফিরছেন কঙ্গনা

১৯

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হতে হবে : নীরব

২০
X