দুদিন বাদেই কোরবানি ঈদ। ইতোমধ্যে বন্দর নগরীসহ সারাদেশে জমে উঠছে গরুর বাজার। জেলা-উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকভর্তি গরু আসছে বাজারে। দেশি গরুর রঙের সঙ্গে সীমান্ত পথে পাচার হওয়া গরুও মিশে গেছে। যদিও বলা হচ্ছে, কোরবানির জন্য প্রস্তুত দেশের খামারে উৎপাদিত গরু। কিন্তু হাটে গিয়ে মিলছে ভিন্ন চিত্র।
দেশীয় গরুর রঙের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মিয়ানমারের গরু। এমন চিত্র কর্ণফুলী থানাধীন মইজ্জ্যারটেক বাজার, সাতকানিয়া কেরানিরহাট বাজারে। এ ছাড়াও ট্রাকভর্তি গরু চকরিয়া হয়ে নগরীর বিভিন্ন হাঁটে পৌঁছে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদিন পর কোরবানি ঈদ হলেও চোরাকারবারিদের ঈদের আগেই শুরু হয় ঈদ। যদিও কোরবানির সময় ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসবে না– সরকারের এমন ঘোষণায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন খামারিরা। এখন সীমান্ত দিয়ে দেদার গরু প্রবেশ করাই লোকসানের শঙ্কায় তারা।
যদিও প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত পথে গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা।
তথ্যমতে, দেশে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে ২০ লাখ খামার আছে। এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭; যা চাহিদার চেয়ে প্রায় ২৩ লাখ বেশি। এ সংখ্যা গত বছরের চেয়েও ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪টি বেশি। কয়েক বছর ধরে কোরবানি ঈদের আগে সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় আসেনি পশু। তবে এবার সীমান্ত অনেকটাই ঢিলেঢালা।
খামারিরা বলছেন, দেশে বৈধপথে পশু আনতে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। অথচ চোরাইপথে আসা গরুর শরীরে রোগ আছে কি না, তা জানার সুযোগ নেই। দেশজুড়ে অজানা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, রামু, চকরিয়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, সিলেট, কুমিল্লা, লালমনিরহাটসহ ছয় জেলার ৩৮ সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে পশু ঢুকেছে সবচেয়ে বেশি। চোরাকারবারি চক্র গরু সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে দুই গ্রুপের লোক। এক গ্রুপ গরুর সঙ্গেই থাকে; আরেক গ্রুপ রাস্তায় পুলিশ, বিএসএফ, বিজিবি থাকে কি না, তা জেনে কারবারির কাছে খবর পৌঁছায়। এ কাজে তারা গরুপ্রতি পায় দুই হাজার টাকা। সীমান্ত পার হওয়ার পর দেশের কোনো হাট থেকে টাকা দিয়ে তৈরি করে নেয় গরু কেনার নকল কাগজপত্র। পথে পড়তে হয় না পুলিশি ঝক্কি-ঝামেলায়।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর হয়ে রামু ঈদগাহ বাজারের প্রভাবশালী রমজানুল আলমের গরুর আড়তে এনে ট্রাক ভর্তি করে মহাসড়ক দিয়ে পাচার করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। নাইক্ষ্যংছড়ির ভালোবাসা, কম্বনিয়া, তুমব্রু, বাম হাতিরছড়া, ফুলতলী, চাকঢালা, লম্বাশিয়া, ভাল্লুকখাইয়া, দৌছড়ি, বাইশফাঁড়ি, আশারতলী, জামছড়ি এবং রামুর হাজিরপাড়া ও মৌলভীরকাটা দিয়েও চোরাই পথে আসছে মিয়ানমারের গরু। কোরবানিকে ঘিরে চিহ্নিত ১৪ ব্যক্তির নেতৃত্বে বেপরোয়া দুই শতাধিক চোরাকারবারি। এসব গরু ট্রাকযোগে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। রামু ও নাইক্ষ্যংছড়িতে রয়েছে বিশাল চক্র।
পাহাড়তলী দক্ষিণ কাট্টলী সংলগ্ন ফিসবো এগ্রোর স্বত্বাধিকারী মো. সানি বলেন, প্রতিটি বাজার ভিনদেশি গরুতে সয়লাব। কিন্তু সরকার থেকে বলা হয়েছিল রোগের কারণে কোরবানিতে এলাউ না। তবুও থেমে নেই চোরাকারবারিরা। তবে ভিনদেশি গরু প্রভাবে খামারিদের কোনো ক্ষতি হবে না, হবে ক্রেতাদের। কারণ আমরা সবদিক বিবেচনায় খামারে গরুগুলোকে লালনপালন করে থাকি, চিকিৎসা করাই। মাংসও সুস্বাদু। অপরদিকে পশুর হাটে ক্রেতারা কম দামে ভিনদেশি গরু কিনলেও শঙ্কা থেকে যায়, রোগমুক্ত কি না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বাইরের গরু যাতে ঢুকতে না পারে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে। হাটে ভিনদেশি গরুর বিষয়ে খামারিরা অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকও হয়েছে।
চোরাইপথে গরু পাচার ঠেকাতে আপনারা কতটুকু সোচ্চার জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. শিবলী নোমান কালবেলাকে বলেন, আমাদের নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। পাশাপাশি চেকপোস্ট চলমান। আমাদের কেরানিহাট, লোহাগাড়ায় চেকপোস্ট আছে। রাতেও ট্রাকে করে চোরাইপথে গরু পাচার ঠেকাতে আমরা নজরদারি করছি।
মন্তব্য করুন