মোহনীয় সুর তুলে গ্রামগঞ্জের পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে বাঁশের বাঁশি বিক্রি করেন শফিকুল ইসলাম সরকার (৬১)। জীবনের একপর্যায়ে এসে বাঁশির সুরের প্রতি প্রবল প্রেম জন্মালে এর মায়া ছাড়তে পারেননি। পরে জীবন-জীবিকার মাধ্যম হিসেবেও বেছে নেন বাঁশি বিক্রি। সেই থেকে ২৫ বছর ধরে পথে-ঘাটে হেঁটে হেঁটে সুর তুলে যাচ্ছেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম সরকার কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি ওই ইউনিয়নের মৃত জব্বার সরকারের ছেলে।
একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। অবসর নেওয়ার পর থেকেই তার বাঁশির সঙ্গে জীবন-যাপনের শুরু। তার সংগ্রহে রয়েছে বাঁশের তৈরি মোহন বাঁশি, মুরালি বাঁশি, বাঁশরি বাঁশি, বড় মুখ বাঁশি, বেজ বাঁশি ও ছোটদের বাঁশি।
শুক্রবার (২২ আগস্ট) সদর উপজেলার বাজারে বসে কথা হয় শফিকুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে। বাঁশিতে গ্রামবাংলার চিরচেনা গানের সুর তুলে বাঁশি বিক্রি করছিলেন।
কথার একপর্যায়ে জানালেন, একসময় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে বাঁশি বিক্রি করেছেন। ঢাকা থেকে তিনি কুমিল্লায় চলে আসেন। তার পর থেকে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বাঁশি বাজানো ও বিক্রির কাজ করছেন। বাঁশিও তিনি সংগ্রহ করেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে।
শফিকুল ইসলাম জানালেন, বাঁশি বাজানো শেখায় তার কোনো শিক্ষক ছিল না। বাঁশির সুরের প্রতি ভালোবাসা, একান্ত চেষ্টা আর আগ্রহই তাকে পারদর্শী করে তুলেছে। পুরোনো দিনের বাংলা গান, পল্লিগীতি, ভাটিয়ালি, লালন, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক বাংলা গানসহ বিভিন্ন সুর তুলতে পারেন। আর এই দক্ষতা অর্জন করেছেন ২৫ বছর ধরে।
সময়ের সঙ্গে বাঁশির কদর কমে গেছে বলে জানালেন শফিকুল। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলেন, ‘মানুষ এখন আগের মতো শখ করেও বাঁশি কেনে না। তবে তেমন বিক্রি না হলেও বাঁশিতে সুর তুললে অনেকেই এসে ভিড় করে চুপটি করে শোনে।’
বিলাসবহুল জীবন চালানোর ইচ্ছা তার কখনোই ছিল না বলে জানান শফিকুল। বলেন, ‘প্রতিদিন সাত থেকে আটশ টাকার বাঁশি বিক্রি করি। এক সময় দ্বিগুণ বাঁশি বিক্রি হতো।’
প্রতিদিন দীর্ঘসময় পথ হাঁটতে হয়। বয়সের ভারে শরীরেও আর তেমন কুলাতে পারেন না। পরিবারও চায় তিনি পেশা বদল করুন। তবে শফিকুল হাস্যোজ্বল ভঙ্গিতে বললেন, ‘বাঁশির সুর আমার রক্তে, আত্মার সঙ্গে মিশে গেছে। ইচ্ছা করলেও ছাড়তে পারি না। বাঁশির সুরের সঙ্গে থাকলেই ভালো থাকি। এ জীবনে আর বাঁশি ছাড়া বাঁচা যাবে না।’
মন্তব্য করুন