

সিলেটই ভূমিকম্পের বিপজ্জনক এলাকা হয়ে উঠেছে। ভৌগোলিকভাবে সিলেটের দক্ষিণ প্রান্তে ডাউকি ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বে ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত কপিলি ফল্ট দুটিই সিলেটের কাছাকাছি। যে কোনো একটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সিলেট। এ কারণে সিলেটকে ভূমিকম্পের ‘ডেঞ্জার জোন’ চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, দায়সারা অবস্থায় বসে রয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন।
জানা গেছে, সিলেট মহানগরীতে সাত তলার অধিক ৪৩৯টি বহুতল ভবনসহ ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৩১টি ভবন রয়েছে। ২০১৯ সালে কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর ঝুঁকি মোকাবিলায় সিলেট নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা, সব বহুতল ভবনের ভূমিকম্প সহনীয়তা পরীক্ষাসহ কিছু উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। এ সময়ে নগরের প্রায় ৪২ হাজার বহুতল ভবন পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। কিন্তু অর্থ সংকটে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। তবে অনেক পুরোনো কয়েকটি ভবন বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার পর নগরের ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করে সিসিক।
ওইদিনই নগরের সুরমা মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেট, মধুবন সুপার মার্কেট, সমবায় মার্কেট, মিতালী ম্যানশন ও রাজা ম্যানশন নামের ৭টি বিপণিবিতানকে ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর নির্ধারিত ১০ দিন পর কোনো সংস্কার ছাড়াই খুলে দেওয়া হয় বন্ধ করা ভবনগুলো। এখনো এগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা চারটি ভবনকে অপসারণ এবং আরও দুটি ভবনকে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সংস্কার করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি স্থাপনাগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সিসিক। এসব স্থাপনার মধ্যে বাসাবাড়ি, বিদ্যালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। নগর প্রশাসনের এমন দুর্বলতাকে পুঁজি করে উল্টো খোলস পাল্টে ফেলা হয়েছে এসব স্থাপনার।
সিসিকের তালিকা অনুযায়ী, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো হলো—কালেক্টরেট ভবন-৩, সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় ভবন, সুরমা মার্কেট, বন্দর বাজার এলাকার সিটি সুপার মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, দরগা গেইটের আজমীর হোটেল, মধুবন মার্কেট, কালাশীল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন। যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন, পুরানলেন এলাকার ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ী এলাকার ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা- ৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা- ৩৭৭/৮ ও শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা- ৩৭৭/৯, বনকলাপাড়া এলাকার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘী দক্ষিনপাড়ের পৌর বিপনী ও পৌর শপিং সেন্টার, এবং পূর্ব পীরমহল্লার লেচুবাগান এলাকার ৬২/বি- প্রভাতী, শ্রীধরা হাউস।
এতদিন এসব ভবনের ব্যাপারে নির্বিকার ছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ফলে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ সিলেটে এসব ভবন ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শুক্র ও শনিবার কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে আতঙ্কের মধ্যে এবার এই ভবনগুলো ভেঙে ফেলা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এতে নড়েচড়ে বসে সিসিকও।
সোমবার বেলা ৩টায় ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিসহ জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের নিয়ে জরুরি সভায় বসে সিসিক।
সভায় বক্তারা, ভূমিকম্প উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত সব সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রাখা, ভূমিকম্প পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগে থেকেই সব উদ্ধার যন্ত্রপাতি তৈরি রাখা, কোন সংস্থার কাছে কী ধরনের যন্ত্রপাতি আছে তার ডাটাবেজ তৈরি করা, দুর্যোগ এলেই যাতে সবকিছু সহজেই পাওয়া যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা, পুরোনো স্বেচ্ছাসেবকদের আবার প্রশিক্ষণ দেওয়া, নতুন করে স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করার প্রস্তাব দেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম ভূমিকম্প হলে যাতে মানুষ নিরাপদ স্থানে যেতে পারে সেজন্য নিরাপদ বৃহৎ খালি জায়গা প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, গত একযুগে সিলেট সিটি করপোরেশন একটিও দুর্বল বিল্ডিং অনুমোদন দেয়নি। বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করলে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা আরও বাড়াতে আমরা সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমাদের অনেক যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলোতে প্রস্তুত রাখছি, যাতে সময়মতো হাতের কাছে পাওয়া যায়। দুর্যোগকবলিতদের উদ্ধারের জন্য আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করব।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম কালবেলাকে বলেন, দুর্যোগের সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া যায় না। তাই এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরোনো স্বেচ্ছাসেকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি নতুন নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করতে হবে। যন্ত্রপাতির ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যাতে যথাসময়ে সেগুলোকে কাজে লাগানো যায়।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত সব ভবন ভেঙে ফেলা হবে। আরও কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে কি না তা যাচাই করতে নতুন করে এসেসমেন্ট করা হবে। উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সেগুলোকে ভাঙা হবে। জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি উদ্ধার কাজের জন্য আরও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে তুলে ধরা হবে। নিজেদের নিরাপদ রাখতে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করতে তিনি নগরবাসীকে অনুরোধ জানান।
সভায় সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, জালালাবাদ গ্যাস, আনসার ভিডিপি, সিভিল সার্জনের কার্যালয়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, ইসলামিক রিলিফ, বিএনসিসি, স্কাউট, গার্লস গাইড প্রতিনিধিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।