তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৪, ১১:৪৪ এএম
অনলাইন সংস্করণ

শিকলে বাঁধা নূর আলমের জীবন

সাত বছর ধরে শিকলবন্দি নূর আলম। ছবি : কালবেলা
সাত বছর ধরে শিকলবন্দি নূর আলম। ছবি : কালবেলা

প্রায় সাত বছর আগেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন নূর আলম। সংসারজীবনে হয়েছেন তিন মেয়ে ও এক ছেলের বাবা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সাত বছর ধরে শিকলবন্দি জীবনযাপন করছেন তিনি।

নূর আলম পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার সর্দারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় পরিবারের হাল ধরতে নাতি-নাতনিদের নিয়ে শ্রমিকের কাজ করছেন মা নুর নেহার।

জানা গেছে, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান নূর আলম। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে একটা সময় তেঁতুলিয়ার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মহানন্দা নদীতে নুড়ি পাথর উত্তোলনের কাজ করতেন। পাথর উত্তোলনের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করায় আটক হয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে।

এতে তিন বছরেরও বেশি সময় ভারতে কারাবন্দি ছিলেন। বন্দি দশা থেকে দেশে ফিরলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ফলে নিজ বাড়িতে সাত বছর ধরে শিকলবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।

নূর আলমের মা নুর নেহার বলেন, আমার ছেলে নূর আগে ভালো ছিল। মহানন্দা নদীতে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে বিএসএফের কাছে আটক হয়। পরে তাকে ভারতে কারাগারে নিয়ে বন্দি করে রাখে। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে সে নিজে নিজে কথা বলে। একপর্যায় পাগল হয়ে যায়। তার পেছনে অনেক টাকা খরচ করেছি কিন্তু সুস্থ করতে পারিনি।

তিনি বলেন, সে বদমেজাজি টাইপের। বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যায়। পরে বাইরের মানুষ, এমনকি আমাদের মারধর করে। এ নিয়ে সবাই অভিযোগ করে। তাই সাত বছর ধরে তাকে ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি।

নুর নেহার আরও বলেন, মানুষের বাসায় কাজ করে ছেলে ও তার সন্তানদের নিয়ে কোনোরকম বেঁচে আছি। আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই যে ছেলের ভালো চিকিৎসা করাব। তাই বাধ্য হয়ে আমার সন্তানকে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। তার জীবনযাপন দেখে আর সহ্য করতে পারছি না। তাই আমি আমার সন্তানের চিকিৎসার জন্য সরকার ও সমাজের সবার কাছে সহযোগিতা চাই।

নূর আলমের সন্তানরা জানান, বুঝ হওয়ার পর থেকে বাবাকে পাগল অবস্থায় দেখছি। খুব কষ্ট হয় বাবার এমন দশা দেখে। অন্যদের মতো আমাদেরও ইচ্ছে করে বাবার সঙ্গে একটু ভালোভাবে থাকতে।

প্রতিবেশী বর্ষা আক্তার বলেন, নূর আমার ফুফাতো ভাই হয়। দীর্ঘ সাত বছর থেকে এমন অবস্থায় খুব কষ্টে আছে পরিবারটি। আয় রোজগারের লোক না থাকায় অনেক সময় অনাহারে দিন অতিবাহিত করে। এর মধ্যে আমরা স্থানীয়রা যতটুকু পারি তাদের সহায়তা করি।

আরেক প্রতিবেশি নারগিস বেগম বলেন, নূরের এমন অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগে। তাকে শিকল ছাড়া রাখলে স্থানীয়দের ওপর হামলা করে। তাই বন্দি করে রাখা হয়েছে। টাকার অভাবে পরিবারটি চিকিৎসা করাতে পারেনি। যদি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় বা তার চিকিৎসার জন্য কেউ তার পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় তাহলে সে সুস্থ হয়ে উঠবে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক ফেরদৌস আলম লিটন বলেন, আমার পাশের গ্রামের বাসিন্দা নূর। সে দীর্ঘ সাত বছর ধরে শিকল বন্দি জীবনযাপন করছে। তার মা ও সন্তানরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না। সরকার কিংবা সমাজের মানুষ তার চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসলে হয়তো সে সুস্থ হয়ে উঠবে ।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে রাব্বি কালবেলাকে বলেন, আমি এর আগেও বিষয়টি জেনেছি। তার ভারসাম্যহীনতার কারণে এলাকায় নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে স্থানীয় ও জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তে পরিবারটি তাকে শিকল বন্দি করে রেখেছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যতটুকু সম্ভব পরিবারটির পাশে থেকে চিকিৎসার সহায়তা করা হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার জিয়াবাড়ি সাজছে নতুন রূপে

‘মুস্তাফিজের জায়গায় লিটন বা সৌম্য হলে কি একই সিদ্ধান্ত নিত বিসিসিআই?’

তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চলের সফর স্থগিত : মির্জা ফখরুল

প্রিয় মাতৃভূমির বদনখানি মলিন হতে দেব না : শিক্ষা সচিব

বিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক চলছে

গণঅধিকার থেকে নুরুকে বহিষ্কারের তথ্যটি ভুয়া

এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন

পতিত স্বৈরাচার নির্বাচন বানচাল করতে চায় : সালাহউদ্দিন আহমদ

হ্যাটট্রিক করে বিপিএলে মৃত্যুঞ্জয়ের অনন্য কীর্তি

১০

রেকর্ড দরপতনে ইরানের রিয়াল, ডলার ছাড়াল ১৪ লাখ ৭০ হাজার

১১

বিপিএল ছাড়ার হুমকি ঢাকা ক্যাপিটালসের

১২

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই : জামায়াত

১৩

প্রিমিয়ার লিগ জয়ের জন্য শক্তি বাড়াল ম্যানসিটি

১৪

যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান আলোচনা, নিবিড় পর্যবেক্ষণে ভারত

১৫

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার / কেন বাংলাদেশে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে চাইছে পাকিস্তান

১৬

খালেদা জিয়া জনগণের মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন : কবীর ভূঁইয়া

১৭

খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় জেডআরএফের দোয়া মাহফিল

১৮

মাঠেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লেন ক্রিকেটার

১৯

যশোর সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার আত্মপ্রকাশ 

২০
X