মাসুদ রানা
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৩, ০৭:৪৬ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩, ০৮:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
তারেক-জুবাইদার সাজা

যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে

তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান। পুরোনো ছবি
তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান। পুরোনো ছবি

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পলাতক আসামি তারেক রহমানের দুই ধারায় ৯ বছরের সাজা দিয়েছেন আদালত। তারেককে সহযোগিতার অভিযোগে জুবাইদা রহমানের তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২ আগস্ট) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামানের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। বিচারক রায় ঘোষণার সময় তারেক-জুবাইদার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

রায় পড়ার সময় বিচারক বলেন, স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তারেক রহমান তার সম্পদবিবরণীতে ২ কোটি ১৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করেছেন। তিনি যেটা প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার সম্পদ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। এতে তার মোট ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া গেছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের বারিধারা প্রকল্পে তার মেয়ে জাইমা রহমানের নামে ১০ কাটা জমি ছিল। সেটা তারেক রহমান গোপন করেছেন। দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় বিনিয়োগ লুকিয়েছেন। অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এক কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা লোন দেন। সব মিলিয়ে এক কোটি ৭৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা তিনি গোপন করেন। তিনি তার সম্পদ বিবরণে শেয়ার ক্রয় বিনিয়োগ দেখিয়েছেন। তবে তার অতিরিক্ত আড়াই লাখ টাকার শেয়ারের তথ্য পাওয়া গেছে। যা তিনি গোপন করেন। এবি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় যৌথ অ্যাকাউন্টে তারেক রহমানের ৪৭ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। যা তিনি গোপন করেছেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তারেক রহমানের অনুরোধে ইসলাম গ্রুপের চেয়ারম্যান তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেখানে ডুপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করে দেন। এ ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে দুই কোটি ৪৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। তার মধ্যে তারেক রহমান ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। তিনি এই বাড়ির তথ্য গোপন করেছেন। তবে তিনি বাড়ি সংস্কারে ২০ লাখ টাকা খরচ করেছেন বলে দেখান। অথচ বিবরণ অনুযায়ী তার কোনো বাড়ি নেই।

বিচারক আরও বলেন, আসামি জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ টাকার আয়ের উৎস্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি দাবি করেন, ৩৫ লাখ টাকা তার মা উপহার দিয়েছেন। যা দিয়ে তিনি ২৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকার দুটি এফডিআর করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি। তারেক ও জুবাইদা তাদের মেয়ের নামে ২০ লাখ টাকা এফডিআর করেন। যা তিনি রহমান গ্রুপ থেকে লোন নিয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে লোন নেওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এ ছাড়া বগুড়া জেলায় গাবতলি থানায় তার সম্পদবিবরণীতে দেখান সেখানে তার দুই একর জমি রয়েছে। তিনি তার আয় করা অর্থ দিয়ে ক্রয় করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে তার আয়কর ফাইল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই বছর তার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে। তার কোনো সঞ্চয় ছিল না। যে কারণে তার দাবি টেকেনি।

এদিন সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আদালতের আশপাশ এলাকায়ও সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিপন্থি আইনজীবী কালো পতাকা ও কালো কাপড় মাথায় বেঁধে আদালত চত্বরে উপস্থিত হতে থাকেন। তারেক ও জুবাইদার বিরুদ্ধে হওয়া রায় ঘিরে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তখন তারা নানা স্লোগান দিতে থাকেন। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা তারেক ও জুবাইদার সর্বোচ্চ সাজা দাবিতে অবস্থান নিতে থাকেন। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের আইনজীবী মুখোমুখি হওয়া স্লোগান দিতে থাকেন।

এরপর বিকেল ৩টা ১৯ মিনিটে বিচারক আদালতে উপস্থিত হন। বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। বিকেল ৪টা ২ মিনিটে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় শেষে আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। রায়ে তারেক ও জুবাইদাকে সাজা দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জুতা মিছিল শুরু করেন। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা আনন্দ মিছিল করেন। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হলেও পরবর্তীতে বিএনপির আইনজীবীরা চলে যান।

রায়ের আদেশে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় তিন বছর ও ২৭(১) ধারায় ৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে বলে উল্লেখ করা হয়। একই আইনের ১০৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে জুবাইদা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুই কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আরও পড়ুন : কালবৈশাখীর ঝড়ে উড়ে যাবে তারেক-জুবাইদার রায় : রিজভী

এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘এ মামলায় আমরা সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করেছিলাম। তবে আদালত যে রায় দিয়েছেন তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’

মামলার বিবরণে জানা যায়, ঘোষিত আয়ের বাইরে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬১ টাকার মালিক হওয়া এবং সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় এ মামলা করে দুদক। মামলায় তারেক রহমান, জুবাইদা রহমান ও তার মা অর্থাৎ তারেক রহমানের শাশুড়ি ইকবাল মান্দ বানুকে আসামি করা হয়। ২০০৮ সালে তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এরপরই মামলা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন জুবাইদা। ওই বছরই এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল হাইকোর্ট জুবায়দার করা মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে রায় দেন। একইসঙ্গে ওই মামলায় আট সপ্তাহের মধ্যে জুবাইদাকে বিচারিক আদালতে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এ খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে ওই বছরই লিভ-টু-আপিল করেন জোবাইদা। এরপর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ লিভ-টু-আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর গত ১৩ এপ্রিল আদালত পলাতক তারেক ও জোবাইদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

আরও পড়ুন : দেশে যে আইনের শাসন আছে, এ রায় তারই প্রতিফলন

গত ২১ মে আদালতে মামলার বাদী দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল হুদার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এরপর গত ২৪ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম শেষ সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন। এ নিয়ে মামলাটিতে ৫৬ সাক্ষীর মধ্যে ৪২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই দুদকের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সম্পত্তির ভাগ নিয়ে দুই ভাই আলাল দুলালের যুদ্ধ!

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে এইচএসসি পরীক্ষার হলে বৈশাখী

রাত নামলেই পাহাড় থেকে নেমে আসে হাতির পাল, আতঙ্কে এলাকাবাসী

জাইকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা এলজিআরডি মন্ত্রীর

ইরানের সেনাবাহিনীকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি: দাবি ট্রাম্পের

পেঁয়াজের দামে ধস, কৃষকদের পক্ষে সরকারের দ্বারস্থ সালথার ইউএনও

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা

সোহরাওয়ার্দী কলেজ সাংবাদিক সমিতির ফল উৎসব ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বোরহানের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তের নির্দেশ

অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টাদের বিচার চায় গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য

১০

পূবালী ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্যাশলেস ধানমন্ডি’ শীর্ষক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

১১

অতি বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘বাভি’

১২

বিশ্বকাপে রাতজাগা দর্শকদের জন্য ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ সুবিধা

১৩

ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান, ৮ নার্সারি মালিককে জরিমানা

১৪

বাজার মনিটরিং কার্যক্রমকে প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব বাণিজ্য সচিবের

১৫

পাঁচ মাস পর সাগরপথে ইরানের সঙ্গে কাতারের বাণিজ্য শুরু

১৬

চালু হলো দেশের প্রথম থানাভিত্তিক ‘প্রবাসী হেল্প ডেস্ক’

১৭

সিলেটে হাম ও নিউমোনিয়ায় আরও এক শিশুর মৃত্যু

১৮

হামে শিশু মৃত্যু / ইউনূসসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হবে কি না, আদেশ ১২ জুলাই

১৯

‘ওয়ান-টু-থ্রি’ বলে গাছ নামানোর সময় আশ্রমের সেবায়েতের মৃত্যু

২০
X