

সোনালি রঙের গরম পরোটা বা পেস্ট্রির আকর্ষণ, আবার টাটকা সবুজ সালাদের সতেজ ভাব– আমরা অনেক সময় বুঝতে না পারলেও, আমাদের চারপাশের রঙ আমাদের মন, সিদ্ধান্ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ক্ষুধার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। কিছু রঙ আমাদের খেতে আরও আগ্রহী করে তোলে, আবার কিছু রঙ ক্ষুধা কমিয়ে দেয়।
যারা বাড়িতে রান্না করেন, তাদের জন্য রঙের এই প্রভাব জানা খুবই কাজে আসে। খাবারের রঙ ঠিকভাবে ব্যবহার করলে খাবার আরও আকর্ষণীয় ও তৃপ্তিদায়ক মনে হয়। আবার বেশি তেল-মশলাযুক্ত বা ভারী খাবার পরিবেশনের সময় এমন রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অজান্তেই পরিমিত খেতে সাহায্য করে।
পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব বা বন্ধুদের আড্ডায় খাবার পরিবেশনের সময় রঙের মনস্তত্ত্ব বুঝলে পরিবেশের আমেজও সহজে ঠিক করা যায়। এই লেখায় আমরা দেখব - কোন কোন রঙ ক্ষুধা বাড়ায়, কোনগুলো কমায় এবং কীভাবে এগুলো রান্না ও পরিবেশনে কাজে লাগানো যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত রঙকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
উষ্ণ রঙ : লাল, কমলা, হলুদ
ঠান্ডা রঙ : সবুজ, নীল, বেগুনি
একই খাবারকে আলাদা রঙের আলো বা ফিল্টারে দেখিয়ে মানুষের পছন্দ যাচাই করা হলে দেখা যায়, বেশিরভাগ মানুষ উষ্ণ রঙের খাবারকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। অর্থাৎ, উষ্ণ রঙ ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে।
লাল রঙ : ক্ষুধা সবচেয়ে বেশি বাড়ায়
লাল রঙ শরীরের হার্টবিট ও রক্তচাপ সামান্য বাড়ায়, ফলে শরীর সক্রিয় হয় এবং খাওয়ার আগ্রহ বেড়ে যায়। তাই লাল রঙকে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষুধা উদ্দীপক ধরা হয়। টমেটো, লাল ক্যাপসিকাম, বিট, লাল মরিচ - এই সব খাবার শিশুদের প্লেটে রাখলে সবজি খাওয়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।
কমলা রঙ : নজর কাড়ে এবং আড্ডা জমায়
কমলা রঙ আনন্দময় ও প্রাণবন্ত। এটি মানুষকে কথা বলতে, আড্ডা দিতে উৎসাহিত করে, যা পরোক্ষভাবে খাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে পারে। গাজর, পাকা পেঁপে, কমলা, কুমড়া– এই রঙের খাবার থালাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
হলুদ রঙ : আনন্দ আর শক্তির প্রতীক
হলুদ রঙ সূর্যের আলো ও সুখের সঙ্গে যুক্ত। এই রঙ মানুষকে ভালো মুডে রাখে, ফলে অনেক সময় মানুষ না ভেবেই একটু বেশি খেয়ে ফেলে। হলুদ সাধারণত লাল বা কমলার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করলে ক্ষুধা ও মেজাজ দুটোই ভালো থাকে। (যেমন : হলুদ ডাল, লেবু, আম)
সবুজ রঙ : সতেজতা ও স্বাস্থ্য
সবুজ মানেই টাটকা, প্রাকৃতিক এবং স্বাস্থ্যকর। তবে সবুজ রঙ সব খাবারে সমান আকর্ষণীয় নাও লাগতে পারে। শাকসবজি, সালাদ বা ধনেপাতা দিয়ে সাজালে অতিথিদের কাছে খাবার স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর মনে হয়।
কিছু রঙ খাবারে খুব কমই প্রাকৃতিকভাবে দেখা যায়। তাই অবচেতন মনে এগুলো ক্ষুধা কমিয়ে দেয়।
নীল রঙ : খুব কম প্রাকৃতিক খাবারে পাওয়া যায়
প্রকৃতিতে নীল খাবার খুবই বিরল। তাই নীল রঙকে সাধারণত ক্ষুধা কমানোর রঙ ধরা হয়। এটি শান্ত ভাব তৈরি করে, কিন্তু খাওয়ার আগ্রহ বাড়ায় না।
বেগুনি রঙ : রাজকীয় হলেও সবার পছন্দ নয়
বেগুনি রঙের খাবার খুব কম— যেমন বেগুন, বেগুনি বাঁধাকপি, লাল পেঁয়াজ। অনেকেই এই রঙের খাবারে ততটা আকর্ষণ অনুভব করেন না।
কালো রঙ : খাবারে কম আকর্ষণীয়
কালো রঙ সাধারণত খাবারের প্রাকৃতিক রঙ নয়, তাই অনেকেই কালো খাবার এড়িয়ে চলেন। তবে থালা, প্লেট বা টেবিল সাজানোর ক্ষেত্রে কালো রঙ খাবারকে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারে।
বাদামি রঙ : আরামদায়ক বা অরুচিকর দুটোই হতে পারে
বাদামি রঙ রুটি, কেক, বিস্কুটের সঙ্গে মানানসই। তবে বেশি বাদামি দেখালে পোড়া বা অতিরিক্ত রান্না করা মনে হতে পারে। বেক করা খাবার ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে এই রঙ সীমিতভাবে ব্যবহার করাই ভালো।
খাবারের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবারের রঙও আমাদের ক্ষুধা ও অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। লাল, কমলা ও হলুদের মতো উষ্ণ রঙ ক্ষুধা বাড়ায় এবং খাবারকে আকর্ষণীয় করে তোলে। অন্যদিকে নীল, বেগুনি বা কালোর মতো রঙ ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভারতীয় উপমহাদেশে যেখানে খাবার মানেই রঙ, গন্ধ আর আনন্দ - সেখানে রান্না ও পরিবেশনের সময় রঙের সঠিক ব্যবহার খাবারের অভিজ্ঞতাকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। দৈনন্দিন খাবার হোক বা উৎসবের আয়োজন, রঙের ছোট্ট সচেতন ব্যবহারেই খাবার হয়ে উঠতে পারে আরও উপভোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও স্মরণীয়।
সূত্র : Escoffier
মন্তব্য করুন