

আমাদের চারপাশের শব্দগুলো সাধারণত স্বাভাবিক এবং অপ্রতিরোধ্য মনে হয় - মানুষের কথা, গাড়ির আওয়াজ, পানির ঝরঝরানি। কিন্তু কিছু মানুষের জন্য এই স্বাভাবিক শব্দগুলোই অসহনীয় হয়ে ওঠে। এমন অবস্থাকে বলা হয় হাইপারঅ্যাকিউসিস।
হাইপারঅ্যাকিউসিসে আক্রান্ত মানুষ যেকোনো সাধারণ শব্দও অতিরিক্ত জোরে, অস্বস্তিকর বা ভয়ংকর মনে করতে পারে। এটি শুধু কানে সমস্যা নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে এবং সামাজিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
আজ আমরা সহজ ভাষায় হাইপারঅ্যাকিউসিস কী, এর লক্ষণ, কারণ এবং প্রভাব সম্পর্কে জানব, যাতে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং আক্রান্তরা প্রয়োজনীয় সমাধানের পথে এগোতে পারে।
হাইপারঅ্যাকিউসিস হলো এমন একটি শ্রবণজনিত সমস্যা যেখানে অন্যদের কাছে স্বাভাবিক মনে হওয়া শব্দ খুব বেশি জোরে, অস্বস্তিকর বা অসহনীয় মনে হয়। একে অনেক সময় শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়া বলেও বলা হয়।
স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি থাকলে মানুষ বিভিন্ন শব্দকে বিভিন্ন মাত্রায় জোরে বা আস্তে শুনতে পারে। কিন্তু হাইপারঅ্যাকিউসিসে আক্রান্ত হলে মনে হয় যেন সব শব্দের ভলিউম অযথা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাইপারঅ্যাকিউসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে নিচের মতো দৈনন্দিন শব্দগুলোও কষ্টদায়ক হতে পারে -
- মানুষের স্বাভাবিক কথাবার্তা
- গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ
- রান্নাঘরের কল থেকে পানির শব্দ
- ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির আওয়াজ
- বই বা পত্রিকার পাতা ওল্টানোর শব্দ
- আরও অনেক নরম ও হালকা শব্দ
এই অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়ায়, মানুষকে খিটখিটে ও উদ্বিগ্ন করে তোলে। অনেকেই সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন, কারণ সেখানে জোরে শব্দ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হাইপারঅ্যাকিউসিস প্রায়ই টিনিটাস নামের আরেকটি সমস্যার সঙ্গে দেখা যায়। টিনিটাসে কানে ভোঁ ভোঁ, শোঁ শোঁ, ক্লিক বা গর্জনের মতো শব্দ শোনা যায়। তবে সব ক্ষেত্রে হাইপারঅ্যাকিউসিসের সঙ্গে টিনিটাস বা শ্রবণশক্তি হ্রাস থাকেই এমন নয়।
এই সমস্যা নিয়ে এখনো অনেক কিছুই গবেষণাধীন। ধারণা করা হয় - শিশু ও কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৩% থেকে ১৭% এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৮% থেকে ১৫% মানুষ হাইপারঅ্যাকিউসিসে ভুগতে পারেন।
সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন, কারণ মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্নভাবে প্রকাশ করে এবং এই সমস্যাটি পরিমাপের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি নেই।
হাইপারঅ্যাকিউসিসে আক্রান্ত হলে যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে—
- স্বাভাবিক শব্দ অসহ্য বা কষ্টদায়ক লাগা
- কানে ব্যথা
- কানে চাপ বা ভরাট ভাব (যেমন বিমানে ওঠার সময় হয়)
- কানে শোঁ শোঁ বা ভোঁ ভোঁ শব্দ
কিছু ক্ষেত্রে শব্দের তীব্রতা এত বেশি মনে হতে পারে যে ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হয় বা খিঁচুনি পর্যন্ত হতে পারে।
এই সমস্যা দীর্ঘদিন চললে হতে পারে—
- উদ্বেগ
- বিষণ্নতা
- সম্পর্কের টানাপোড়েন
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
বিশেষ করে মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত ক্লান্তির সময় উপসর্গ আরও বেড়ে যেতে পারে।
হাইপারঅ্যাকিউসিসের নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই। গবেষকদের ধারণা, মস্তিষ্কের যে অংশ শব্দের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে সমস্যা হলে শব্দ অস্বাভাবিকভাবে জোরে মনে হতে পারে।
সম্ভাব্য কিছু কারণ ও ব্যাখ্যা—
শ্রবণ স্নায়ুর ক্ষতি, যা কানের ভেতর থেকে মস্তিষ্কে শব্দের সংকেত বহন করে
মুখের স্নায়ুর ক্ষতি, যা কানের ভেতরের একটি পেশি নিয়ন্ত্রণ করে এবং শব্দের তীব্রতা সামলাতে সাহায্য করে
হাইপারঅ্যাকিউসিসের সঙ্গে যেসব বিষয় জড়িত থাকতে পারে—
- দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা (যেমন জোরে গান শোনা বা শব্দপূর্ণ কর্মস্থল)
- হঠাৎ খুব জোরে শব্দ শোনা (যেমন বিস্ফোরণ বা আতশবাজি)
- এছাড়া এটি অনেক সময় নিচের সমস্যাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত—
- উদ্বেগ ও বিষণ্নতা
- অটিজম
- কানের সংক্রমণ
- মাথায় আঘাত
- মাইগ্রেন
- পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস
- টিনিটাস
- কিছু জেনেটিক বা স্নায়বিক অবস্থা
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হাইপারঅ্যাকিউসিস এমন একটি সমস্যা যা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন, কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এটি খুবই বাস্তব ও কষ্টদায়ক। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ শব্দই যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন মানসিক ও সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। যদিও এর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে সচেতনতা, সঠিক মূল্যায়ন ও উপযুক্ত থেরাপির মাধ্যমে উপসর্গ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সময়মতো সাহায্য নেওয়া ও নিজের সীমাবদ্ধতাকে বোঝা - এই দুটোই হাইপারঅ্যাকিউসিস নিয়ে ভালোভাবে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সূত্র : Cleveland Clinic
মন্তব্য করুন