কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৫২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

দরিয়া-ই-নূর যেভাবে বাংলাদেশে

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

দরিয়া-ই-নূর নামটি যেমন চমৎকার, তার অর্থও তেমনই সুন্দর—‘আলোর সমুদ্র’। এই হীরাটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও মূল্যবান রত্নগুলোর একটি। দেখতে অনেকটা কোহিনূরের মতো দরিয়া-ই-নূরের আকৃতি আয়তাকার এবং এর ওজন ২৬ ক্যারেট। এর চারপাশে ছিল আরও দশটি ছোট ডিম্বাকৃতির হীরা, যেগুলোর প্রতিটির ওজন ছিল প্রায় ৫ ক্যারেট করে। সব মিলিয়ে এই হীরাটির মোট ওজন দাঁড়ায় ৭৬ ক্যারেট। ধারণা করা হয়, এই হীরাটিও কোহিনূরের মতো দক্ষিণ ভারতের গলকোন্ডা খনি থেকেই পাওয়া গিয়েছিল।

প্রথমে দরিয়া-ই-নূর ছিল মারাঠা রাজাদের দখলে। এরপর হায়দরাবাদের নওয়াব সিরাজুল মুলক এটি কিনে নেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায়। কিছুদিন পর হীরাটি পারস্য সম্রাটের হাতে চলে যায়, এবং সম্ভবত তখনই এর নামকরণ হয় দরিয়া-ই-নূর। পরবর্তীতে এটি পাঞ্জাবের শাসক রণজিৎ সিংহের কাছে আসে। ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন পাঞ্জাব দখল করে, তখন কোহিনূরের সঙ্গে দরিয়া-ই-নূরও তাদের দখলে চলে যায়। সেই সময় এর মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৩ হাজার টাকা।

১৮৫০ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে রানী ভিক্টোরিয়ার সম্মানে এক প্রদর্শনী মেলা হয়। সেখানে দরিয়া-ই-নূরসহ বহু মূল্যবান রত্ন প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু দর্শকদের মাঝে এটি আশানুরূপ আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। তাই সিদ্ধান্ত হয় হীরাটি ভারতে ফেরত এনে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। ১৮৫২ সালে কলকাতায় হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় দরিয়া-ই-নূরের নিলাম হয় এবং ঢাকার নওয়াব খাজা আলীমুল্লাহ এটি ৭৫ হাজার টাকায় কিনে নেন। নওয়াব পরিবার হীরাটি একটি স্বর্ণের বাজুবন্দে বসিয়ে অলংকার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। পরবর্তীতে হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানির সহায়তায় ঢাকার নওয়াবদের রত্নভাণ্ডার নিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, যেখানে দরিয়া-ই-নূর ছিল অন্যতম আকর্ষণ।

১৮৮৭ সালে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ও লেডি ডাফরিন কলকাতার বালিগঞ্জের নওয়াব ভবনে এসে হীরাটি প্রত্যক্ষ করেন। ১৯০৮ সালে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ এটি বন্ধক রেখে সরকারের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। তখন এর মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫ লক্ষ টাকা। ঋণ শোধ করতে না পেরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন হীরাটি বিক্রি করবেন। ১৯১১ সালে এটি আবার ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়, কিন্তু ইউরোপীয় বাজারেও এটি কাঙ্ক্ষিত মূল্য পায়নি। সর্বোচ্চ দাম ওঠে মাত্র ১৫০০ পাউন্ড। পরে হীরাটি ফেরত এনে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানির অধীনে সংরক্ষিত রাখা হয়।

১৯১২ সালে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানী মেরী ভারতের সফরে এসে হীরাটি দেখেন। সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর হীরাটি ঢাকার নওয়াব এস্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের তত্ত্বাবধানে চলে আসে। ভারত ভাগের পর এটি কলকাতা থেকে এনে ঢাকার ইম্পেরিয়াল ব্যাংকে রাখা হয়। বর্তমানে হীরাটি সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত আছে, যেখানে কড়া নিরাপত্তায় এটি রাখা হয়েছে। ১৯৮৫ সালে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, দরিয়া-ই-নূর একটি সম্পূর্ণ খাঁটি এবং অকৃত্রিম হীরক।

এ হীরাটি শুধু একটি মূল্যবান রত্ন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। বিভিন্ন রাজবংশ, উপনিবেশিক শাসন এবং আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের মধ্য দিয়ে যে ইতিহাস গড়ে উঠেছে, দরিয়া-ই-নূর তারই নীরব সাক্ষী। এটি পৃথিবীর অন্যতম বড় গোলাপি রঙের হীরা এবং অনেকে মনে করেন, এটি এক বিশাল হীরার অংশ—যার আরেকটি অংশ ইরানে সংরক্ষিত, যার নাম ‘নূর-উল-আইন’। বহু হাত ঘুরে, বহু দেশে প্রদর্শিত হয়ে এখন এটি বাংলাদেশেই সংরক্ষিত রয়েছে, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গর্বিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দীর্ঘ ছুটি শেষ / খুলেছে স্কুল-কলেজ, এখনো বন্ধ অনেক প্রতিষ্ঠান

চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে ২ পা বিচ্ছিন্ন হওয়া সেই যুবকের মৃত্যু

মিসরকে হারিয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি শেষ করলো ব্রাজিল

দেশের ১৭ অঞ্চলে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরেও সতর্কতা

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে রহস্যজনক তাপ, উৎস খুঁজছে পুলিশ-ফায়ার সার্ভিস

আন্তর্জাতিক রোবটিক্স অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক পেলেন বাংলাদেশের প্রিয়ন্ত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ

রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ

৩০০ জনকে চাকরি দেবে আবুল খায়ের গ্রুপ, অভিজ্ঞতা ছাড়াও আবেদন

নিয়োগ দিচ্ছে এসিআই কোম্পানি, অনলাইনে আবেদন শুরু

১০

রেড ক্রিসেন্টে চাকরির সুযোগ, আবেদন করতে পারবেন যারা

১১

এসএসসি পাসেই চাকরির সুযোগ, বেতন ছাড়াও থাকছে বিভিন্ন সুবিধা

১২

দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আ.লীগ নেতাকে নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ

১৩

আজকের নামাজের সময়সূচি

১৪

গভীর রাতে হঠাৎ ক্ষুধা লাগলে কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন?

১৫

ডিজিটাল গণমাধ্যম অগ্রদূতের আত্মপ্রকাশ

১৬

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাদের ওপর ‘আ.লীগের’ হামলা, আহত ১৮

১৭

রাজনীতিতেই থাকতে চাই, চাকরি নয় : ছাত্রদল নেতার আবেগঘন স্ট্যাটাস

১৮

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ / জিম্মায় নেওয়া চুরির মালামাল থানায় ফেরত দিলেন কর্মকর্তা

১৯

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের সভা অনুষ্ঠিত

২০
X