সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ভয়াবহ সহিংসতার পর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে দেশ। রাজধানীসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। গত দুদিন কোথাও ছিল না দুর্বৃত্তদের তৎপরতা। ঘটেনি জ্বালাও-পোড়াও কিংবা নাশকতা। ফলে কয়েকদিনের আতঙ্ক ও শঙ্কা কাটিয়ে জনমনে বইতে শুরু করেছে স্বস্তির হাওয়া। নিরাপত্তার স্বার্থে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে কারফিউ বলবৎ থাকলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সার্বিক জীবনযাত্রা।
জীবিকার তাগিদে আবার ঘর থেকে বের হতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। বেশ কয়েকদিন অবরুদ্ধ থাকার পর সচল হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তায় মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি সীমিত পরিসরে গণপরিবহনও চলেছে।
কোটা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সুযোগে গত কয়েকদিন রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় দুর্বৃত্তরা। অগ্নিসংযোগ করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভি ভবন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ভবন, সেতু ভবন, বিআরটিএ ভবন, বেপজা ও বিসিএসআইআরসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে। আগুন থেকে বাদ যায়নি সরকারি হাসপাতালও। ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এবং লুটপাট চলেছে মেট্রোরেলের মতো স্থাপনায়ও। পুড়িয়ে দেওয়া হয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা।
নরসিংদী কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দিদের বের করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য সরকারি ও ব্যক্তিগত যানবাহন। এসব ঘটনায় অনেক হতাহতের পাশাপাশি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
এ বিভীষিকা থেকে দেশকে রক্ষা করতে প্রথমে বিজিবি এবং পরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সরকার। সেইসঙ্গে গত শনিবার (২০ জুলাই) রাত থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়। এর পরই ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে দৃশ্যপট।
সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ভূমিকায় পিছু হটতে বাধ্য হয় নাশকতাকারীরা। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। ভয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে সবখানে। প্রতিদিনই বাড়ানো হচ্ছে কারফিউ শিথিলের সময়সীমা। বুধবার (২৪ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ থাকছে না।
তিন দিন সাধারণ ছুটির পর খুলছে অফিস-আদালত ও ব্যাংক-বীমা। এরই মধ্যে হাটবাজার, বিপণিবিতান ও পাড়া-মহল্লার দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। সর্বত্রই বেড়েছে সাধারণ মানুষের আনাগোনা। চালু হয়েছে ইন্টারনেট সেবা। সব মিলিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসছে জীবনযাত্রা।
মঙ্গলবার রাজধানীর সায়েদাবাদ, খিলগাঁও, মালিবাগ, শান্তিনগর, মহাখালী, বনানী, মিরপুর, কাকরাইল, শাহবাগ, হাতিরপুল, কাঁটাবন, সায়েন্স ল্যাব ও নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিনের ভয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে রাস্তাঘাটে বেরিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। রাস্তায় রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়িও অনেকটা কমেছে।
ফলে জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও অনেককেই রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। কাজের সন্ধানে বেরিয়েছেন অনেক দিনমজুর। আবার কারফিউর মধ্যে শান্ত রাজধানীর চিত্র দেখতে বেরিয়েছেন কেউ কেউ। যাত্রীর অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা যায় অনেক মোটরবাইক চালককে। পাড়ার অলিগলি ছাপিয়ে রাজধানীর মূল সড়কেও বসেছে চায়ের আড্ডা। কোনো কোনো ফুটপাতে বসেছে পণ্যের পসরা। সেখানে ক্রেতাদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো কোনো এলাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও কফিশপেও চলেছে আড্ডা।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের আশপাশের অনেক রেস্তোরাঁ ও কফিশপে ভিড় দেখা যায় অন্য ছুটির সময়ের মতোই। ব্যস্ত নগরীর সুনসান সড়কের কোথাও কোথাও যান চলাচলের ফাঁকে ফাঁকে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় দুরন্ত কিশোরদের। মুগদা এলাকার অটোরিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, গত দুদিনের তুলনায় রিকশার যাত্রী বেড়েছে। মনে হচ্ছে, অবরুদ্ধ অবস্থা কাটিয়ে দেশ স্বাভাবিক হচ্ছে।
খিলগাঁও রেলগেট এলাকায় ভাসমান ফল বিক্রেতা রফিক জানান, আন্দোলন ও অবরোধের কারণে তার অনেক ফল নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ক্রেতা না থাকায় আমে পচন ধরেছে। তবে মঙ্গলবার অনেক মানুষ রাস্তায় বেরিয়েছে। সেজন্য বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো।
এদিকে নাশকতাকারীদের শাস্তি নিশ্চিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতাসহ অন্তত দেড় সহস্রাধিক লোককে। তাদের অনেককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নাশকতাকারীদের আইনের মুখোমুখি করতে বদ্ধপরিকর প্রশাসন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি এবং জনজীবন স্বাভাবিক হওয়ায় পর্যায়ক্রমে কারফিউ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ থাকছে না। সেইসঙ্গে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অফিস খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পরিস্থিতি অনুযায়ী কারফিউ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন। সব মিলিয়ে দ্রুতই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা করছেন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। এরপর পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন