দেশের ২৯ জন শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিক বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, লুটপাট, উপাসনালয়ে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। সেইসঙ্গে জনমনে নিরাপত্তাবোধ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (৭ আগস্ট) এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে ২৯ বিশিষ্ট নাগরিক।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনের নামে পুলিশের গুলিতে এবং অন্যদের হামলায় পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণ হারিয়েছেন যাদের বেশিরভাগই নিরস্ত্র শিক্ষার্থী, শিশু, নারী ও সাধারণ নাগরিক, কিছু পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং সংবাদকর্মী যারা তাদের পেশাগত দায়িত্বপালনের সময় নিহত হয়েছেন। নিহত ও আহত হওয়ার কোনো বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী যিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কার্যকাল শুরু করলেও গত ১০-১১ বছর ধরে যেভাবে দেশ শাসন করেছেন তা তাকে ক্রমাগত এক স্বৈরশাসকে পরিণত করেছিল। সব শেষে গত মধ্য জুলাই থেকে তিনি নিজেকে এক নিষ্ঠুর স্বৈর-শাসকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলেই বিগত দিনগুলিতে আমাদের অভাবনীয় শত শত মৃত্যুর মিছিল প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে।’
তারা বলেন, ‘আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হলে তিনি গত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। ঢাকাসহ সারা দেশের লাখ লাখ মানুষ রাজপথে তাদের উল্লাস প্রকাশ করেছেন। এত ব্যাপক হতাহতের দায় নিয়ে তার পদত্যাগের দাবি পূরণ হওয়ায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-জনতা একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। জাতির এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আমরা সংগ্রামী ছাত্র-জনতাকে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জন্য অভিনন্দন জানাই। কিন্তু একশ্রেণির সুযোগ সন্ধানী মানুষ ও দুষ্কৃতকারী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই পরিস্থিতির শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান, আহমদিয়া সম্প্রদায় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের বাড়িঘরে হামলা করছে। অগ্নিসংযোগ ও শারীরিক নির্যাতনে লিপ্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তারা বিভিন্ন থানা আক্রমণ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও দলিলপত্র লুটপাট ও বিনষ্ট করেছে। আমরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ যে গত কয়েকদিনে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নড়াইল, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, মেহেরপুর, ঢাকাসহ দেশের কমপক্ষে ৩৫টি জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা নন পঞ্চগড় ও রংপুর জেলায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং জামালপুরে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) নাগরিকরাও আক্রান্ত হয়েছেন। অনেক মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে মানবেতর অবস্থায় দিনানিপাত করছেন। এই সকল জনগোষ্ঠীর মানুষরা সকল জেলা ও অঞ্চলে যেকোনো সময় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন। এই অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কবৃন্দ, সেনাবাহিনীর প্রধান এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে তাদের বক্তব্যে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধের কথা বলেছেন। তারপরও আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও তেমন দৃশ্যমান নয়।’
সর্বোপরি স্বাধীন সার্বভৌম এই রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের ওপর হামলা, তাদের নিরাপত্তাহীনতা ও জনমনে ভয়-ভীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া চলবে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিবৃন্দসহ, বৃহত্তর নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সকল বন্ধুদের আরও দৃঢ়ভাবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান এবং তাদের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও সেনাসদস্যদের কাছে ৬টি দাবি তুলে ধরেন। তাহলো- যে কোনো ধরনের অরাজকতা, সহিংসতা, হামলা, লুটতরাজের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাসহ দেশব্যাপী সকল জেলা ও উপজেলায় সেনা মোতায়েন ও তাদের সদা সক্রিয় রাখা। জেলা প্রশাসন এবং মাঠ পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত আপডেট নেওয়া জরুরি। সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের বাড়িঘর, দোকানপাটসহ সকল স্থাপনা, মন্দির, গির্জাসহ সকল উপাসনালয়ের সুরক্ষা দেওয়া। তার জন্য বিশেষ নির্দেশনা গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা। মুক্তিযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অসম্মান করার সকল অপতৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করা। এর উসকানি/ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করা। শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমন্বয়ক ও অন্যান্য নেতাদের তাদের বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা প্রতিরোধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জনসম্পদ সুরক্ষার বিষয়টি প্রতিনিয়ত বলা। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কার্যকর সুরক্ষায় তাদের স্বেচ্ছাসেবা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এ সকল ব্যাপারে গণমাধ্যমের সোচ্চার ভূমিকা আরও জোরদার করা। সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষক ও অভিভাবক সমাজ, সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনকে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা প্রতিরোধ, গণলুটপাট, থানা আক্রমণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবার যে কোনো প্রচেষ্টাকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করা।
মন্তব্য করুন