আমরা মেধাবী। জনদুর্ভোগ হলে আমাদের কী? আমরা মেধাবী, আমাদের লাভ হলেই হলো! কিন্তু আসলেই কী আমরা মেধার পরিচয় রাখছি সম্প্রতি কোটাবিরোধী আন্দোলনে? আমাদের সবকিছু কেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজন? কেন গঠনমূলক কোনো দাবি আমরা করছি না। রাজপথ আর গণমাধ্যমের সামনে বিভিন্ন কথা বলা ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম এবং নির্বাহী বিভাগকে সিদ্ধান্ত প্রণোয়নে আলোচনায় বসার কোনো কথা কী আমরা বলছি? আমরা কী আসলেই কোটা বাতিল চাচ্ছি, নাকি কোটা পুনর্বহাল চাচ্ছি? আন্দোলনে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই এ প্রশ্নের উত্তরগুলো স্পষ্ট নয়। তাহলে আন্দোলন করছি কেন আমরা? যে আন্দোলনে হাজার হাজার শ্রমিক ও চাকরিজীবীদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৯-২০২৩ মেয়াদে পাঁচ বছরে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ৫৮ হাজার ২৩৭টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর নিয়োগ পেয়েছেন ৭১ হাজার ৬৪৮ জন। সে হিসেবে দৈনিক সর্বোচ্চ নিয়োগ হয়েছে ২০০ জনের কাছাকাছি। তাহলে কি এটাই বলব, গেল দুই সপ্তাহে ২৮০০ জনের চাকরির জন্য রুটি-রুজি হারিয়েছে বা হুমকির মুখে পড়েছে লাখ লাখ মানুষের। এটাই কি আমাদের মেধার পরিচয়?
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সবাই বলছেন সরকারের সব দরজায় তারা গিয়েছেন সবাই তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন করতে চাই, সরকারের কোন কোন দরজায় তারা গিয়েছেন? আদালতে চলমান মামলায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী একা লড়াই করে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে। সরকারের প্রতিটি বিভাগ থেকে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। সে সঙ্গে কোটা সংস্কারের অধিকার নির্বাহী বিভাগের হাতে ফিরিয়ে আনার যে আইনি লড়াই, সেখানেও বিজয়ী হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু আইনি প্রক্রিয় এখনো বাকি। এমন অবস্থায় জাতীয় সংসদে আইন করার দাবি আসলে কতটা যৌক্তিক। আমরা মেধাবী হিসেবে এতটুকু নিশ্চয়ই জানি, দেশের বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগ ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করে এবং এখানে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। সংসদে আইন করেও যদি কোনো একটি কোটা সংস্কার প্রথা পাস করা হয়, সেটি আইন বিভাগে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যেমনটা নির্বাহী বিভাগের আদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে। নিজেদের মেধাবী দাবি করা আমরা কি এই তিন বিভাগের কাজের পরিধী এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখি না! তাহলে কিসের মেধার দাবি করছি আমরা।
কোটা আন্দোলনে বিগত কয়েক দিনে জনদুর্ভোগ ও সাংবাদিক পিটিয়ে আহত করাসহ সহিংস কার্যক্রমের কথা জানা গেছে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি পেশের পর ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে আরও একবার জনদুর্ভোগের হুমকি প্রদান কী বার্তা দিচ্ছে? আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মানুষগুলো কী সমাধান চাচ্ছেন? নাকি তারা অকারণ সংঘাতের দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঠেলে দিচ্ছেন। এ সংঘাতের মাধ্যমে তারা কী অর্জন করবেন?
আন্দোলনের শুরু থেকে যে অহিংস বার্তা ও প্রস্তাবনা উঠে আসে, তার সঙ্গে একমত আমি। আমার মতো সব চাকরিপ্রত্যাশী। ৫৬ শতাংশ কোটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যখন আমাদের অহিংস কার্যক্রম থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা আসে বা অনলাইনে গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে বার্তা প্রদান করা হয়, সহিংস উসকানির কথা বলা হয়, তখন যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের কী কোনো দায় নেই? তারা কী সহিংসতার দিকেই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে বলছেন? অন্যথায় সমাধানে বসার জন্য বা কোটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সকলের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য কোনো আহ্বান বা সুপারিশ কোথাও নেই কেন? সরকারের কাছে কেন জানতে চাওয়া হচ্ছে না এ কার্যক্রম পরিচালনায় কতদিন সময় চাচ্ছে সরকার? সরকার কোনো একটি সময় বেঁধে দিলে সে সময় নিয়েও তো আমরা আলোচনা করতে পারি। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমে এখন আইন বিভাগকে জড়িত করার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কেননা এসব বিভাগ একত্রে একটি বিষয় নিয়ে কাজ করলে প্রকৃত অর্থে কোটা সংস্কার কার্যকরের প্রস্তাব আরও দীর্ঘায়িত হবে। এটা কী আমরা বুঝে দাবিগুলো করছি? যদি বুঝে করে থাকি তাহলে এটি স্পষ্ট, আমরা আসলে আন্দোলন দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে চাচ্ছি। কোটা সংস্কার আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। আর এই আন্দোলনকালীন সময়ে সব নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে যাদের চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমাদের ভাবনা কী?
আমরা সবাই জানি, সরকারের নির্বাহী বিভাগকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কোটা সংস্কার দ্রুতগতিতে করাই আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পূববর্তী কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে ফল মেলে সে বছরের নভেম্বর মাসে। আর পূর্ণ ফল মেলে নির্বাহী বিভাগের আদেশে ২০২০ সালে। অর্থাৎ এটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সময়সাপেক্ষ বিষয়। শুধু নির্বাহী বিভাগের হাতে ক্ষমতা থাকলে সব পরিবর্তন এনে নতুন কোটা বিন্যাস সাজানো ও তার ব্যাখ্যা তৈরিতে কয়েক মাস লেগে যাওয়া বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোটা সংস্কার নিয়ে দৈনিক আল্টিমেটাম দেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে সরকারকে কী উসকানি প্রদান করা হচ্ছে না? যেখানে আন্দোলনরত সবাই জানেন যে, ১ দিনের মধ্যে এর কোনো কিছুই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাহলে গঠনমূলক প্রস্তাবনাটি কী? এত এত মেধার সম্মিলন রাজপথে। অথচ প্রকৃত অর্থে গঠনমূলক আলোচনা নেই। তাহলে আমরা রাজপথে কোন মেধার পরিচয় দিচ্ছি। লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে প্রতি বছর মাত্র ৭১ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে যুক্ত হচ্ছি আমরা। সরকারি চাকরিটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে ভাই পাঠাও চালান, যে ভাই সিএনজি চালান বা রিকশা চালান তাদের জীবিকার কথা কে ভাববে? সেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা কে ভাববে যার নিয়মিত কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হাসপাতালে যেতে হয়। সেই শিশুর কথা কে ভাববে, যার অ্যাম্বুলেন্সে থাকা দীর্ঘ সময়ে অক্সিজেন প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে?
প্রকৃত অর্থে আমরা নিজেদের তখনই মেধাবী বলতে পারব, যখন রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি গঠনমূলক আলোচনার জন্য আমরা প্রস্তাব দেব। নিশ্চিতভাবেই আমাদের আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া না হলে আমরা রাজপথে আন্দোলন করব। কিন্তু গঠনমূলক কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া রাজপথে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির আন্দোলনের সঙ্গে আমি একমত নই। রাষ্ট্রের চতুর্থ কাঠামো হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম ও তার কর্মীদের ওপর আক্রমণ করা আন্দোলনের প্রতি আমার সমর্থন নেই। আমার ধারণা সহিংস কার্যক্রমে কোনো মেধাবীদেরই আগ্রহ নেই। আর এ কারণেই এখন আন্দোলনে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সে শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দ্রুত গঠনমূলক কার্যক্রম ও আলোচনায় বসা জরুরি।
মো. আশরাফুল আলম খন্দকার, ইউল্যাবের সাবেক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী।
মন্তব্য করুন