মুজাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

টুপির রাজনীতি ও নির্বাচন

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ বদলায়, আর নির্বাচন এলে বদলায় রাজনীতিবিদদের অবয়ব। বছরের বাকি সময় যাদের আধুনিক স্যুট-কোট বা বাহারি পোশাকে দেখা যায়, ভোটের হাওয়া বইতেই তাদের আলমারি থেকে বেরিয়ে আসে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর নেকি টুপি। এ যেন এক জাদুকরী রূপান্তর! যদিও তারা কি আসলে নিজেরা টুপি পরেন নাকি জনগণকে টুপি পরান, সেটা বিস্তর চিন্তার বিষয়। তবে এই টুপির রাজনীতি যে ভোটের মাঠে মোটের ওপর মুনাফাদায়ী, তাতে মনে হয় কারো দ্বিমত থাকবে না। আর তাই এবারও নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই রাজনীতিবিদদের মাথায় শোভা পাচ্ছে টুপি। কারণ ভোটের মাঠে টুপির মুনাফার হিসেব বুঝতে তারা কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নন।

ভোটের এই ‘মৌসুমি টুপিপ্রীতি’র গভীরে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদ এখনো যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ। সাধারণ মানুষের কাছে টুপি বা তসবিহ কেবল পোশাক নয়, বরং নৈতিকতা, সততা ও শুদ্ধাচারের প্রতীক। রাজনীতিবিদরা খুব ভালো করেই জানেন, যুক্তির চেয়ে আবেগ এ দেশে দ্রুত কাজ করে। তাই একজন প্রার্থী যখন টুপি পরে মঞ্চে দাঁড়ান, তিনি আসলে নিঃশব্দে তিনটি শক্তিশালী বার্তা দেন: এক, নৈতিক বিশুদ্ধতা: আমি একজন খোদাভীরু মানুষ, তাই আমি দুর্নীতিমুক্ত থাকব। দুই, সাংস্কৃতিক নৈকট্য : আমি আপনাদেরই একজন, আপনাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশীদার। তিন, ঐতিহ্যের ধারক : আমি এ দেশের হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে ধারণ করি।

ভোটের বাজারে ধর্মের মার্কেটিং এই দেশে নতুন কোনো প্রডাক্ট নয়। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এই প্রডাক্টের কাটতি বেশ ভালো। শোনা যায়, ’৫৪-এর নির্বাচনে ফতোয়া এসেছিল— মুসলিম লীগকে ভোট না দিলে নাকি ‘বিবি তালাক’ হয়ে যাবে! কী ভয়ংকর অফার! স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রডাক্ট ব্যান করা হলেও, সামরিক শাসকরা তাকে আবার নতুন প্যাকেজিংয়ে বাজারে ফিরিয়ে আনেন।

এরপর থেকে সব বড় দলই এই লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ কিংবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’— এই ধরনের স্লোগানগুলো ছিল সেই সময়ের সফল মার্কেটিং জিঙ্গেল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার হিজাব ও তসবিহসহ পোস্টার ছিল এক দুর্দান্ত রি-ব্র্যান্ডিং কৌশল। সেই ধারাবাহিকতায়, টুপি এখন নির্বাচনী প্রচারণার এক অবিচ্ছেদ্য ফ্যাশন অনুষঙ্গ।

মজার ব্যাপার হলো, এই টুপি পরার হিড়িক এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত দলের নেতারাও আজকাল সমান তালে টুপি মাথায় দিয়ে আধ্যাত্মিকতার দৌড়ে শামিল হয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহার করে প্রচার চালানো নিষেধ? আরে ধুর! টুপি তো কোনো প্রচার নয়, এ তো নিছকই এক 'হেডওয়্যার'! মিনার বা শঙ্খ যখন নির্বাচনী প্রতীক হতে পারে, তখন মাথায় এক টুকরো কাপড় পরা তো নস্যি!

তবে সময় বদলেছে। বিশ-ত্রিশ বছর আগে যে কৌশল অনায়াসে কাজ করত, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তা এখন বুমেরাং হয়ে ফিরছে। ফেসবুক-ইউটিউবের আর্কাইভ নেতাদের অতীত ও বর্তমানের বৈপরীত্য মুহূর্তেই সামনে এনে দিচ্ছে। সম্প্রতি এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেল, ঢাকা-৮ আসনের এক তরুণ প্রার্থীকে এক ভোটার মুখের ওপর বলে দিলেন, ‘ভাই, এই যে নির্বাচনের জন্য টুপিটা পরছেন, এতদিন তো আপনার মাথায় চুল ছাড়া আর কিছু দেখিনি!’ এই একটি ঘটনাই হলো এই মৌসুমি ধার্মিকতার নাটকের একটি বাজে রিভিউ। কুমিল্লা-৪ আসনের এক প্রার্থী তো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, নির্বাচনের আগে ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি আর লম্বা টুপি পরে মাঠে নেমে যাওয়ার এই 'হিপোক্রেসি' এখন পাবলিক ধরে ফেলেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচনের পর নেতাদের এই টুপিগুলো ড্রয়ারে বন্দি হয়ে যায়। যারা নির্বাচনের আগে বড় বড় ধর্মীয় বুলি আওড়ান, গদিতে বসার পর তাদের অনেকের আচরণে সেই ধার্মিকতার লেশমাত্র থাকে না। ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যম বানানোয় ধর্ম যেমন কলুষিত হয়, তেমনি রাজনীতির প্রতিও সাধারণ মানুষের এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। একে এক প্রকার ‘পলিটিক্যাল মার্কেটিং’ বলা যেতে পারে, যেখানে ধর্ম একটি ‘পণ্য’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পরিশেষে, রাজনীতিতে প্রতীক থাকবেই, কিন্তু প্রতীক যখন প্রবঞ্চনার হাতিয়ার হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। রাজনীতিবিদদের বোঝা উচিত, টুপি পরা অপরাধ নয়, কিন্তু টুপিকে ভোটের ফাঁদ বানানো নৈতিক অপরাধ। জনগণ এখন আর কেবল ‘লেবাস’ দেখে মুগ্ধ হওয়ার মতো বোকা নেই; তারা এখন প্রার্থীর আমলনামা আর কাজের হিসেব মেলাতে জানে।

ভোটের মাঠে টুপি পরে জনগণকে টুপি পরানোর এই পুরোনো খেলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। নেতাদের মনে রাখা উচিত, যে জনগণ তাদের ভোটে জেতায়, সেই জনগণই একদিন সচেতনতার টুপি পরে নেতাদের আসল রূপ উন্মোচন করে দিতে পারে। দিনশেষে, টুপির চটকদার বিজ্ঞাপনের চেয়ে কর্মের স্বচ্ছতাই হোক রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।

মুজাহিদুল ইসলাম : সংবাদকর্মী

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা আমার কাজ : হামিদ

জানুয়ারিতে এলো ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স

৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুমাসেই স্বামীর করুণ পরিণতি

প্রাইজবন্ডের ১২২তম ড্র অনুষ্ঠিত, লাখপতি হলেন যারা

প্রতিদিনের এই ৭ অভ্যাস বারোটা বাজাচ্ছে আপনার ঘুমের, এখনই সতর্ক হোন

শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে যাচ্ছে পাকিস্তান, তবে...

১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

যে ৪ ব্যক্তি রোজা ভেঙে ফেলতে পারবেন

ছেলের দায়ের আঘাতে প্রাণ গেল মায়ের

ওসমান হাদি হত্যায় গোলাম রাব্বানীর বন্ধু রুবেলের দায় স্বীকার

১০

তারেক রহমানের পক্ষে কোকোর স্ত্রীর উঠান বৈঠক

১১

বিশ্বকাপে ভারত ম্যাচ বয়কট করল পাকিস্তান

১২

কুৎসা রটিয়ে জনগণের ভোট নেওয়া যায় না : মির্জা আব্বাস

১৩

গণভোটে ‘না’ ভোট নিয়ে যা জানালেন মনির হায়দার

১৪

বিজয়ী হলে পরাজিত প্রার্থীদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করব : তুলি

১৫

দুর্নীতিবাজদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না

১৬

ফ্যামিলি কার্ড : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

১৭

এক দিনে কতটা আলু খাওয়া নিরাপদ? জানালেন পুষ্টিবিদ

১৮

ইরানে সামরিক হামলার দিনক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রকে জানিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

১৯

টুপির রাজনীতি ও নির্বাচন

২০
X