রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

আর মাত্র ১০ দিন পরই আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জাতির জীবনে এমন গৌরবময় অধ্যায় আছে, যেখানে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। আমরা সেই গর্বিত জাতি।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার কেউ দয়া করে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করেই আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এ দিনটি কেবল একটি নির্বাচনের তারিখ নয় বরং এটি আবারও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আর এই লড়াইয়ের একমাত্র নায়ক কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা নন—নায়ক হলেন ভোটার নিজেই।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভোটারই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস। সংবিধান, রাষ্ট্র, সরকার—সবকিছুর বৈধতা আসে ভোটারদের সম্মতি থেকে। তাই ভোটার যত সচেতন, যত দৃঢ়, তত শক্তিশালী হয় গণতন্ত্র। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই সত্যটিকেই আবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

গণতন্ত্রে ব্যালট কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়; বরং এটি নীরব বিপ্লবের হাতিয়ার। এই ব্যালট দিয়েই চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ,দখলবাজ, মাদক-সন্ত্রাসী,অন্যায়কারী, বিতর্কিত ব্যক্তি কিংবা ঋণ খেলাপিদের রুখে দেওয়া যায়। ইতিহাস বলে—যখন মানুষ সচেতনভাবে ভোট দেয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী অপশক্তিও পরাজিত হয়।

আমরা প্রায়ই দেখি, হাজার কোটি টাকার মালিক, প্রভাবশালী রাজনীতিক কিংবা ক্ষমতাধর ব্যক্তি নির্বাচনের সময় একজন সাধারণ ভোটারের দরজায় গিয়ে দাঁড়ান। গায়ে কাদা-মাটি মাখা কৃষক, দিনমজুর কিংবা খেটে খাওয়া মানুষটির হাত ধরেন, বুকে জড়িয়ে ধরেন, কুশল বিনিময় করেন। এই দৃশ্যই সবচেয়ে বড় প্রমাণ—গণতন্ত্রে একজন ভোটারের গুরুত্ব কতটা। দিনের শেষে যত বড় নেতা বা ধনীই হোন না কেন, ভোটারের কাছেই তাকে ভোট ভিক্ষা করতে হয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই ১২ ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ভোটার যদি নিজের শক্তি বোঝেন, তবে কোনো অন্যায়কারী টিকে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতায় ভোটাধিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় ধরে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন, অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও অংশগ্রহণহীনতার অভিযোগে মানুষের আস্থা বারবার নষ্ট হয়েছে। বহু মানুষ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—কখনো ভয়, কখনো অনাস্থা, কখনো আবার ভোটের অর্থহীনতার কারণে।

১২ ফেব্রুয়ারি সেই বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ মানে কেবল একটি ভোট দেওয়া নয়; এটি নিজের নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দিন। যারা দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেননি, যারা ভাবতেন ভোট দিয়ে কিছু হয় না—তাদের জন্য এই নির্বাচন একটি পরীক্ষা এবং সম্ভাবনা।

ভোটারদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কাকে ভোট দেবেন? গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। এমন প্রার্থী বেছে নেওয়াই ভোটারের দায়িত্ব, যিনি বিতর্কমুক্ত, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত নন, দখলবাজ বা ঋণখেলাপি নন, দুর্নীতি ও মাদকের পৃষ্ঠপোষক নন। কারণ ভুল নেতৃত্ব মানেই ভুল ভবিষ্যৎ। আজ যদি ভোটার অসচেতন হন, আজ যদি অর্থ, প্রলোভন বা ভয়ের কাছে হার মানেন—তবে শুধু আগামী পাঁচ বছর নয় বরং এর ফল ভোগ করতে হবে পুরো একটি প্রজন্মকে। নাগরিক জীবনে নেমে আসতে পারে অন্ধকার। আইনের শাসন দুর্বল হবে। নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট মানে কেবল ব্যক্তি বা দলের জয়-পরাজয় নয়; এটি নির্ধারণ করবে সমাজ কেমন হবে, রাষ্ট্র কোন পথে চলবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে জোরেশোরে এগিয়ে চলছে। চারদিকে প্রচার-প্রচারণায় মুখর সারা দেশ। পোস্টার, মাইক, মিছিল আর স্লোগানে সরগরম মাঠ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে সহিংসতার খবরও সামনে আসছে। হামলা, ভাঙচুর, সংঘর্ষ—এসব ঘটনা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ভোটারদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে। যা মোটেও কাম্য নয়।

এটি গণতন্ত্রের শত্রু। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব অত্যন্ত বড়। নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা। আর রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

ভোটার যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তবে ভোটের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আজকের বিশ্বে কোনো নির্বাচন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থাকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পথ সুগম করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়, তবে তা শুধু একটি সফল নির্বাচন হিসেবেই নয়—বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত হবে। আর সেই মানদণ্ড পূরণের কেন্দ্রে রয়েছেন ভোটাররাই।

আর মাত্র দশ দিন বাকি। এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী বাছাই, প্রতিশ্রুতি যাচাই, অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ—সবকিছুই এখন ভোটারের দায়িত্ব। আবেগ নয়, যুক্তি; গুজব নয়, তথ্য; ভয় নয়, সাহস—এই তিনটি বিষয় মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির দিনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানে শুধু একটি ব্যালটে সিল মারা নয়; এটি একটি ঘোষণার দিন—“আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন, আমি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না।

এই নির্বাচনে কোনো দল নয়, কোনো নেতা নয়—প্রতিটি ভোটারই একেকজন নায়ক। এই নায়কের হাতেই আছে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা—কে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, কারা প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন, কারা সেবা দেবেন জনগণকে। ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা আবারও প্রমাণ করতে পারি—আমরা জানি কীভাবে অধিকার আদায় করতে হয়, কীভাবে অন্যায়কে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করতে হয়।

ভোটাররাই ১২ ফেব্রুয়ারির আসল নায়ক। এই নায়কের সঠিক সিদ্ধান্তেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর সমাজ। এর ব্যত্যয় হলে আবারও ফিরে আসতে পারে সেই পুরনো ফ্যাসিবাদ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নরসিংদী-৩ আসনে ধানের শীষের উঠান বৈঠকে নারী-পুরুষের ঢল

মুফতি মনির কাসেমীকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা

যারা বছরের পর বছর গুপ্ত ছিলো তারা আমাদের গুপ্ত বলছে : জামায়াত আমির

ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি

আরও কমিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ

মার্কিন দূতাবাসের নতুন নির্দেশনা

সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে না তুরস্ক

তরুণদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বমানের চট্টগ্রাম গড়ব : সাঈদ আল নোমান

নেতা হ্যাঁ ভোট চেয়েছে, কর্মীরা না ভোট চাইলে তাদের বলবেন ‘গুপ্ত’ : আসিফ মাহমুদ

বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার কেউ নাই : ড. জালাল

১০

বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষের পক্ষে থাকবে : তারেক রহমান

১১

গণতন্ত্রের রূপকার খালেদা জিয়া, বাহক তারেক রহমান : বুলু

১২

দেড় বছরে ঢাবিতে ৪১টি কার্যক্রমের উদ্বোধন

১৩

লিচুবাগান থেকে গানপাউডার ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার

১৪

নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজি ও দখল বন্ধ করা হবে : রবিউল বাশার

১৫

জিম্বাবুয়েকে ধসিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান সমাপ্তি 

১৬

প্রচারণায় যাওয়ার সময় জামায়াতের ১৫ নেতাকর্মী নিয়ে ডুবে গেল নৌকা

১৭

আ.লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক গ্রেপ্তার

১৮

ধানের শীষের বিজয় হলে নিপীড়িত মানুষের বিজয় হবে : মান্নান

১৯

১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে স্বর্ণের দামে বড় উত্থান

২০
X