ড. দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৩, ১২:১৬ পিএম
আপডেট : ২৮ জুন ২০২৩, ১২:৫৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ড. দেলোয়ার হোসেন

ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ: আসলে ঘটনা কী?

ড. দেলওয়ার হোসেন
ড. দেলওয়ার হোসেন

সাম্প্রতিক সময় ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ওয়াগনার গ্রুপের রাশিয়া যাত্রা। ওয়াগনার গ্রুপ একটি রুশ আধাসামরিক সংস্থা। একে একটি প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি (PMC), ভাড়াটে সৈনিকদের একটি নেটওয়ার্ক বা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাবেক ঘনিষ্ঠ মিত্র ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের একটি ডি ফ্যাক্টো প্রাইভেট আর্মি হিসেবে দেখা হয়।

রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করা ওয়াগনার গ্রুপ রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রাশিয়ার একটি আঞ্চলিক সামরিক হেডকোয়ার্টারের দখল করে নেয় এবং রাজধানী মস্কোর দিকে মার্চ করে। কেউ কেউ এটাকে পশ্চিমা বিশ্বের একটা কৌশল আবার কেউ কেউ পুতিনের কৌশল বলে মনে করছেন। কিন্তু আসলে ঘটনাটি কী?

ওয়াগনার গ্রুপ একটি ভাড়াটে সামরিক বাহিনী। কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করা গেছে রাশিয়ার সামরিক নেতারা বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এই বাহিনীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারা বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেছে। যুদ্ধাবস্থায় বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন ধরনের আচরণ করতে পারে। এর পেছনে নানা রকমের কারণ থাকতে পারে। ওয়াগনার বাহিনীর বিদ্রোহের কারণ নিশ্চিত করে বলা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। আমরা এখন শুধু অনুমান করতে পারি।

ওয়াগনার গ্রুপের সঙ্গে পশ্চিমাদের একটা যোগাযোগ থাকতে পারে। আবার এই সুযোগে তারা তাদের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারে। একটি দর কষাকষির জায়গা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ভ্লাদিমির পুতিন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এবং ওয়াগনার গ্রুপের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেটি কমাতে চেষ্টা করবেন।

কন্সপারেসি থিউরিতে অনেক কিছুই বলা যায়। বলা যায়, এটি পুতিনের সৃষ্টি—আবার এটাও বলা যায়, এটি পশ্চিমাদের সৃষ্টি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরকম একটা মার্সেনারি বাহিনী সব সময় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে তা আশা করা বাতুলতা মাত্র। এ ধরনের বিদ্রোহমূলক আচরণ সব সময় অপ্রত্যাশিত নয়।

অনেকে মনে করছেন, ওয়াগনার বাহিনীর এই বিদ্রোহের ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তেমন নয়। এই ক্ষণস্থায়ী বিদ্রোহের ফলে যুদ্ধের মোড় ঘোরার মতো তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এ ধরনের আরও ঘটনা হয়তো আমরা দেখব। আমরা দেখেছি এই সময়ে বেলারুশে অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়েছে। রাশিয়ার ভিতরেও ভ্লাদিমির পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হচ্ছে। এই সবকিছুই যুদ্ধেরই অংশ। তবে সেগুলো যুদ্ধের মোড় ঘোরার মতো কোনো পরিস্থিতি নয়।

রাশিয়ার মতো একটি সামরিক পরাশক্তিকে এ ধরনের বিদ্রোহ দিয়ে পরাজিত করা সম্ভব নয় সেটি ওয়াগনার বাহিনী হোক বা অন্য কোনো বাহিনী। এই বিদ্রোহকে যুদ্ধের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। রাশিয়া চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ ধরনের বাহিনীর একটি বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটিও কম আলোচনার বিষয় নয়।

ইউক্রেন যুদ্ধটা আরও অনেক বেশি অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। মাঝখানে যেসব শান্তি প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল সেগুলোও আলোর মুখ দেখেনি। এই মুহূর্তে ওয়াগনার বাহিনীর বিদ্রোহ রাশিয়ার জন্য একটি দুর্ঘটনা। এটি ইউক্রেনে রাশিয়ার অবস্থানকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে।

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ সারা বিশ্বের জন্য সংকট তৈরি করেছে। আমরা সবাই এটার ভুক্তভোগী। আবার কিছু কিছু দেশ এখান থেকে সুবিধা গ্রহণ করছে। এটা রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে যেমন হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে মার্কিনরা সুবিধা পেয়েছে। কোরিয়ান যুদ্ধ থেকে জাপানিজরা সুবিধা পেয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকেও জাপানিজরা বেনিফিটেড হয়েছে। কিছু দেশ সুবিধা পেলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আক্রমণেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্যে পড়েছে।

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসময় বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ চলমান থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে যে মেরুকরণ সেটি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ দর কষাকষির জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ থেকে সুবিধা নেওয়ার মতো কোনো অবস্থানে নেই বাংলাদেশ।

নতুন করে সংকটে পড়ার তেমন কোনো আশঙ্কা বাংলাদেশের সামনে নেই। বাংলাদেশের এখনকার যে সংকটময় পরিস্থিতি রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলমান থাকায় একটি স্থিতাবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। শুরুর দিকে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এখন সেটা নেই। দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলমান থাকায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশের নতুন কোনো সংকটে পড়ার সম্ভাবনা নেই। বিদ্যমান সংকটগুলো মোকাবিলায় সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, সরকারি কর্ম কমিশন

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাত মাস পর কারামুক্তি, ৫ মিনিট পর ফের গ্রেপ্তার

এবারও ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে : তারেক রহমান

জবি সিন্ডিকেটের সদস্য হলেন অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মুর্শেদ

বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজা আজ

রাজউক অধ্যাদেশ জারি, বোর্ড সদস্য হবেন ৭ জন

নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যালট বাক্স ছিনতাই সম্ভব নয় : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

সিজিএসের সংলাপ / ‘মিন্টো রোডে সচিবদের ফ্ল্যাট বিলাসবহুল হোটেলকেও ছাড়িয়ে গেছে’

ঢাবিতে ধানের শীষের পক্ষে ছাত্রদল নেতার শুভেচ্ছা মিছিল 

জবি শিক্ষার্থীদের বিশেষ বৃত্তির তালিকা প্রকাশ

এক্সপ্রেসওয়েতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে টোল দিতে হবে না ঢাবি শিক্ষার্থীদের

১০

ভাসানীর কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় গণভোটকে ‘হ্যাঁ’ বলুন

১১

জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী সমাবেশে অস্ত্রসহ আটক ২

১২

ম্যানইউকে বিদায় বলছেন ক্যাসেমিরো

১৩

একটি দল প্রবাসীদের ব্যালট পেপার দখল করে নিয়েছে : তারেক রহমান

১৪

বিপিএল ফাইনালকে ঘিরে বিসিবির বর্ণিল আয়োজন

১৫

রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনে ধানের শীষই ভরসা : রবিউল

১৬

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল এমপি প্রার্থীর

১৭

ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী জনসভায় জনতার ঢল

১৮

প্রবাসীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের স্ট্যাটাস

১৯

নির্বাচনে এমএফএসের অপব্যবহার রোধে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-বিকাশের সমন্বয় কর্মশালা

২০
X