রহমান মৃধা
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:০৩ পিএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
রহমান মৃধার নিবন্ধ

কেউই কি নেই যে উলার মতো দেশের ভেড়াগুলোকে সরিয়ে রাখে?

রহমান মৃধা। ছবি : সৌজন্য
রহমান মৃধা। ছবি : সৌজন্য

সবকিছুর মতো বিশ্বের নারী ধর্ষণের ওপরও মাঝে মধ্যে জরিপ করা হয়। একেক জরিপে একেক দেশ শীর্ষস্থান অধিকার করে, নির্ভর করে কোন কোন প্রেক্ষাপটে বিচার বিবেচনা করা হয়। কখনো তালিকা তৈরি করা হয় এবং তালিকার এক নম্বরে রয়েছে কোন দেশ সেটাও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। মূলত এসব জরিপ যে সংস্থাগুলো তৈরি করে তারা নারীদের শিক্ষা, আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার- এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে জরিপ করে থাকে, যেমন বিশ্বের অনেক দেশের অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয় এবং দশজনের মধ্যে আটজনই গৃহিণী।

ধর্ষণ পৃথিবীর সব দেশেই কম বেশি হয়ে থাকে। জঘন্যতম এই অপরাধের রাজধানী নাকি দিল্লি! কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি ধর্ষণের নিরিখে অনেকটাই এগিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশগুলো? অনেক রিপোর্ট কিন্তু সে কথাই বলছে। তবে এ কথা ঠিক, অনুন্নত দেশে ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই পুলিশে রিপোর্ট হয় না। তাই অন্ধকারেই চাপা পড়ে থাকে সেসব অত্যাচার।

আমি দেখেছি ধর্ষণের তালিকায় রয়েছে বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের নাম। তবে এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। সারা বিশ্বেই ধর্ষণ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোতে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই শতকরা ৩৩ জন মেয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। বিশ্বের ৩৫ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হলেও চুপ থাকে, ১০ শতাংশ আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেয়।

অনেক সময় দেখবেন খবরে বলা হচ্ছে, ধর্ষণের শীর্ষ স্থানাধিকারী ১০টি দেশের মধ্যে নেই মুসলমানপ্রধান দেশ। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের স্থান পঞ্চম এবং সুইডেন তৃতীয় স্থানে ইত্যাদি। এখন সুইডেনে ধর্ষণের ধরণ সম্পর্কে একটু বর্ণনা করি। এখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধর্ষণের পরিমাণ বেশ লক্ষণীয়। প্রশ্ন হতে পারে সে আবার কী?

বিবাহিত জীবনে ধর্ষণ হয় বেশি, কারণ অনেকের ধারণা বিয়ে করা মানে যা ইচ্ছা তাই করা যেতে পারে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বা ঘুমের ঘোরে যদি কিছু করা হয় সেটা ধর্ষণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতিসহ ধর্ষণের দায়ে জেল হয়ে থাকে।

এছাড়াও যারা বিয়ে করেনি বা যাদের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নেই, যারা সমাজে ছোটবেলা থেকে বাবা-মা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধবী থেকে লাঞ্ছিত, দেখা যায় তারা এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। অনেকে মানসিক অসুস্থতার কারণে ধর্ষণ করে থাকে। সুইডেনসহ ইউরোপ বা আমেরিকায় ধর্ষণকে গোপন রাখা হয় না, এখানে এসব ঘটনার তদন্ত হয় এবং সে সুবাদে জানা যায় কী পরিমাণ ধর্ষণ প্রতিবছর ঘটে যা বিশ্বের অনেক দেশ সেগুলো চাপা রাখে পরিবার, সমাজ বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ভয়ে অথবা আইন এবং বিচার বিভাগের দুর্বল অবকাঠামোর কারণে।

বিশ্বের অনেকের ধারণা, সুইডেন ফ্রি সেক্সের দেশ, সেখানে যা কিছু করা সম্ভব। ফ্রি সেক্স বলতে জৌনতার স্বাধীনতাকে বোঝায়। কে কাকে পছন্দ করবে সেটা তার ব্যাপার, জোর বা ঝুলুম করে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করা বা বলা যাবে না। এমতবস্থায় বুজতে পারছেন কেন সুইডেন ধর্ষণে তৃতীয় স্থানে। তবে বাংলাদেশে যেভাবে ধর্ষণ হচ্ছে সেটার সাথে কি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনা করার প্রয়োজন রয়েছে? আমি যদি চল্লিশ বছর আগে আমার জীবনে ফিরে যাই, তখনো নিশ্চিত ধর্ষণ হয়েছে। তবে তার মাত্রা বর্তমানের মতো ছিল না।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকসেনারা অমানসিক বর্বরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যেভাবে ধর্ষণ করেছিল বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আমরা রাজাকারদের ঘৃণা করি তাদের জঘন্য কর্মের জন্য, ধর্ষণ ছিল এর মধ্যে অন্যতম।

বর্তমানে যারা দিনদুপুরে যাকে খুশি তাকে গণধর্ষণ করছে এরা পাকিস্তানি বা রাজাকারদের বংশধর নয় নিশ্চয়ই। তবে এরা কারা এবং কীভাবে এদের সংখ্যা সমাজে দিনের পর দিন বাড়ছে? শুধু জানলে হবে না এর প্রতিকার করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কে করবে? মনে হচ্ছে আমরা শুধু সমাজে ঘৃণার বীজ বপন করে চলছি, যার কারণে এটা বেড়ে চলছে।

ঘৃণা নয়, ভালোবাসা- যদি এমনটি ভাবতে শুরু করি এবং সেভাবে কাজ করি, তাহলে সম্ভব হবে কি ঘৃণাকে বর্জন করে ভালোবাসাকে অর্জন করা? আমি মনে করি, সম্ভব এবং সেটা শুরু করতে হবে সর্বস্তরে। বারবার পুরোনো ইতিহাস না টেনে বরং সবাইকে ভাবতে হবে নতুন করে, যা হবার হয়েছে, আর নয়, এবার ভালোবাসার পালা। সময় এসেছে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্তে আসা, কে মানুষ আর কে অমানুষ।

আমি সুইডেনে ভেড়ার গোস্ত কিনি এক সুইডিশ মহিলার কাছ থেকে। তার নাম উলা এবং তার কৃষিক্ষেত আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। উলা একোলজি উপায়ে সবকিছু উৎপন্ন করেন। সুইডিশ জাতি তার এই উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞ। সর্বোপরি উলা একজন অবসরপ্রাপ্ত ৮০ বছর বয়সী বিধবা। ইচ্ছা করলে অবসর জীবনটাকে আরাম আয়েশে আর দশজনের মতো কাটিয়ে দিতে পারতেন।

উলা তা না করে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, তাকে কেউ জোর করেনি। উলার ভেড়াগুলো যখন জন্ম নেয় তখন তিনি চেষ্টা করেন যেন সেগুলো একান্নবর্তী পরিবার হিসেবে বসবাস করে। যখনই ভেড়ার বাচ্চাগুলোর বয়স দুই মাস হয় এবং তাদের মধ্যে যৌনতার ভাব দেখা যায় তখনই উলা সেগুলোকে পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলেন। সেইসঙ্গে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেন যেন একই পরিবারভুক্ত ভেড়ার বাচ্চাদের মাঝে যৌনতার সম্পর্ক না ঘটে।

বিষয়টি উলা আমাকে বলেছেন এবং এও বলেছেন ভেড়া তো পশু ওরা আপন ভাইবোনের সম্পর্কটা আমাদের মতো বোঝে না। তাই আমি ওদের যৌনতার সম্পর্কটা যেন মধুর হয়। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করি সবকিছু সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে।

উলার চিন্তা-চেতনা আমাকে বেশ আপ্লুত করেছে। তাই মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করি এবং অনেক গল্প করি। বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো জানার পর মনে পড়ে গেল উলার কথা। কেউই কি নেই যে উলার মতো দেশের ভেড়াগুলোকে সরিয়ে রাখে। কারণ মানুষ নামের দানবগুলো যেহেতু বুঝতে অক্ষম তখন উলার মতো চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের খুবই প্রয়োজন।

রহমান মৃধা: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফরাসি অভিনেতার বাড়িতে মিলল ৭২টি বন্দুক

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের শপথ বিকেলে

নিলাম ছাড়াই সরকারি ব্যারাকের ঘর ভেঙে নিলেন ইউপি সদস্য

ঢাকা আইনজীবী সমিতির ভোটগ্রহণ শুরু 

মৌলভীবাজারে জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস পালিত

নিয়োগ দিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ

তামিম না কি সাকিব, ফাইনালে খেলবে কে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭টি পদে নেবে ১৮১ জন 

ব্রিজ থেকে নদীতে পড়ল বাস, নিহত ৩১

লিপ ইয়ার নিয়ে যেসব তথ্য জানলে অবাক হবেন

১০

আমের মুকুলে মিষ্টি সুবাস

১১

ঢাকার যেসব এলাকায় আজ ১৫ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না 

১২

ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন মৃৎশিল্পীদের

১৩

মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকতে ইসরায়েলকে যা করতে বললেন বাইডেন

১৪

রাজপথ দখলে আবারও মাঠে নামছে ইমরান খানের পিটিআই

১৫

আ.লীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার

১৬

এক শর্তে জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করবে ইয়েমেন

১৭

গাজীপুরে মার্কেটে আগুন

১৮

শিক্ষার্থীকে শাসন করায় শিক্ষককে বেধড়ক মারধর

১৯

প্যারিসে একুশের কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা

২০
X