আগামী ১০ বছরের মধ্যে ন্যাটোর সঙ্গে পূর্ণ মাত্রায় সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। ন্যাটোর সঙ্গে মুখোমুখী সংঘাতের আশঙ্কায় রাশিয়া তার সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনে যুদ্ধে শুরুর ২ বছর পর ক্রেমলিন এমন প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এস্তোনিয়ার সামরিক গোয়েন্দা প্রধানরা।
ভ্লাদিমির পুতিন যখন তার বাহিনীকে ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন অনেকেই ভেবেছিলেন রুশ সেনারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিয়েভ দখল করে নেবে। কিন্তু পুতিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের জন্য ততটা জোর দিয়েছেন বলে মনে হয়নি। কিয়েভে রুশ বাহিনী যে হামলাগুলো চালিয়েছিল সেখানে ছিল যথেষ্ট দুর্বলতা। দুর্বল এসব আক্রমণ ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছু হাঁটতে বাধ্য হয়।
ক্রেমলিনকে প্রায়ই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একারণে ইউক্রেনে পুতিনের সহজ বিজয় দেখছিলেন অনেকে। তবে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর প্রথম মাসগুলো রাশিয়ান সামরিক পরিকল্পনার গভীর ত্রুটি প্রকাশ করে। এসময় মার্কিন এবং বিদেশি কর্মকর্তারা রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে একটি কাগজের বাঘ বলেও মন্তব্য করতে পিছপা হয়নি।
কিন্তু যুদ্ধ যখন তৃতীয় বছরে পদার্পণ করছে, পুতিন ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আলেক্সি নাভালনি মারা গেছেন। ইউক্রেনের জন্য অত্যাবশ্যক মার্কিন সামরিক সহায়তা কংগ্রেসে স্থগিত এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো কাজে আসেনি। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়া তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে। রাশিয়া একটি যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং এর জন্য যথেষ্ট অর্থের জোগান দিচ্ছে তার জ্বালানি শক্তি।
রাশিয়ার জন্য সবকিছুই কমবেশি পরিকল্পনা মাফিক এগোচ্ছে। ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের একটি দলের সঙ্গে বৈঠকের সময় এস্তোনিয়ান ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (ইএফআইএস)-এর মহাপরিচালক কাউপো রোসিন এমনই মন্তব্য করেছেন।
যুদ্ধের শুরুর পর্যায়গুলোর ভুলগুলো থেকে অনেক কিছু শিখেছেন রাশিয়ার সামরিক নেতারা। তারা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। রুশ কমান্ডাররা এখন কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলছেন। কাউপো রোসিন বলছেন, অবস্থাদৃষ্টে এমন মনে হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্র রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালের শেষের দিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাঁঠামো সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। ২০২৬ সালের মধ্যে রুশ সামরিক বাহিনীর আকার ১৫ লক্ষ্যে উন্নীত করার পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন তিনি। এস্তোনিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীতে সংস্কার আনা হচ্ছে যা সোভিয়েত-শৈলীর সেনাবাহিনী হতে পারে এবং এখানে রয়েছে প্রচুর ফায়ারপাওয়ার এবং আর্টিলারি।
ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর সীমান্ত দ্বিগুণ হয়েছে। ইউক্রেন আক্রমণের আগে মস্কো তার পশ্চিম সীমান্তে মোতায়েন করা প্রায় ১৯০০০ সৈন্য সংখ্যাকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছিল। পশ্চিমাঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সৈন্য সংখ্যায় বিচলিত সুইডেনও আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে। ফলে রাশিয়া এখন আরও বেশি ন্যাটোর মুখোমুখী অবস্থানে।
রাশিয়ান তার সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং চলতি বছর রুশ প্রতিরক্ষা বাজেট মোট রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশের সমান। রুশ অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এস্তোনিয়ান সামরিক গোয়েন্দা প্রধান অ্যান্টস কিভিসেলগ বলেছেন, মস্কো তার আর্টিলারি গোলার মজুত ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদনও বাড়িয়ে চলেছে। এমনকি অস্ত্র আমদানির জন্য ক্রেমলিন উত্তর কোরিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকছে। রাশিয়া ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তিনগুণ বেশি আর্টিলারি যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করতে চলেছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে সিএনএন।
জানুয়ারিতে, জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, আগামী পাঁচ থেকে আট বছরের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোর কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রে আক্রমণ করতে পারে। ডেনিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, রাশিয়া যে গতিতে পুনরায় অস্ত্র তৈরি করছে তা ন্যাটো দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের বিপদের বার্তা। এটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে রাশিয়া কোনো একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রে আক্রমণ করবে এবং ন্যাটোর সংহতি পরীক্ষা করবে।
জানুয়ারিতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল প্যাট্রিক স্যান্ডার্স এক বক্তব্যে রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের জন্য ব্রিটিশ জনগণকে প্রস্তুত থাকতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
তবে এস্তোনিয়ান ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের কাউপো রোসিন বলছেন, রাশিয়া এবং ন্যাটোর মধ্যে একটি যুদ্ধ অনিবার্য বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। মস্কোকে আটকাতে এখনও অনেক কিছু করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের পরিস্থিতি কেমন হবে তা অনেকটা নির্ভর করছে পশ্চিমের কার্যকলাপের ওপর। তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ভবিষ্যতের অনেক কিছু নির্ভর করছে।
অ্যামি ম্যাকিনন : ফরেন পলিসির একজন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং গোয়েন্দা রিপোর্টার।
ভাষান্তর : মুজাহিদুল ইসলাম
মন্তব্য করুন