সশরীরে মার্কেটে এ-দোকান থেকে ও-দোকানে ধরনা দিয়ে ঘাম ঝরানো ছাড়া একটা সময় পছন্দের কেনাকাটা কল্পনাই করা যেত না। ডিজিটালের ছোঁয়ায় সেটি এখন কল্পনা নয়; বরং অতিবাস্তবতা। যে কেউ যে কোনো জায়গা থেকে পছন্দের যে কোনো পণ্য যে কোনো ভার্চুয়াল বা অনলাইন শপ থেকে কিনতে পারছেন যখন-তখন। এরপর দিন যত গড়িয়েছে, ঘরে বসে অনলাইন কেনাকাটার প্রতি মানুষের আগ্রহের পারদ শুধুই বেড়েছে। মূলত এই আগ্রহকে পুঁজি করে দেশে এখন রীতিমতো অনলাইন কেনাকাটার একটি খাতই তৈরি হয়ে গেছে। ইলেকট্রনিক কমার্স (ই-কমার্স) এবং সামাজিক যোগাযোগকেন্দ্রিক ব্যবসা তথা এফ-কমার্সের মাধ্যমে এ খাতটি পরিচালিত হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট এবং কিছুটা আস্থাহীনতার মধ্যেও সময়ের চাহিদা বিবেচনায় দেশে উদীয়মান ই-কমার্সের অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধির চাকা থেমে নেই। করোনার সময় দেশের ই-কমার্স খাত ব্যাপক প্রসারিত হয়। করোনার আগে প্রতিবছর এই খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশ, যেটা করোনাকালে ক্ষেত্রবিশেষে ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে করোনা-পরবর্তী বর্তমান সময়ে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে এখন ৪০ শতাংশে অবস্থান করছে। এ ছাড়া আগে যেখানে ই-কমার্সে প্রতি অর্ডারের গড় মূল্য ছিল ১ হাজার টাকার নিচে, এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকায়। এর সঙ্গে সমানতালে বড় হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ব্যবসা তথা এফ-কমার্সও। এই দুই খাত মিলে দেশে এখন ছোট-বড় ৫ লক্ষাধিক উদ্যোক্তা সার্বক্ষণিক অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তবে উদ্যোক্তার সংখ্যা এফ-কমার্সেই বেশি; কিন্তু এরা সংগঠিত নয়। কর্মী বাহিনীও সেভাবে নেই। মূলত এটি অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসার একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম। ফলে উদ্যোক্তার সংখ্যা বেশি হলেও অনলাইন ব্যবসার বাজারের আকার বিবেচনায় মাত্র ২৫ শতাংশ হলো এফ-কমার্সের।
অন্যদিকে এফ-কমার্সের তুলনায় ই-কমার্সের উদ্যোক্তা সংখ্যা অনেক কম। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের মাত্র ২ হাজার ১২৫ সদস্য উদ্যোক্তা রয়েছেন; কিন্তু এদের বিনিয়োগ বেশি। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি এদের ফিজিক্যাল শপ এবং ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে রয়েছে বিরাট কর্মী বাহিনী। এদের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সারা দেশেই পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। সব মিলে সারা দেশে ই-কমার্স এবং এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রায় তিন লাখ কর্মী। প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত লাখ পণ্য সরবরাহ হচ্ছে গ্রাহকদের দোরগোড়ায়। আর পণ্য ও সেবা মিলিয়ে এই খাতের সমন্বিত বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা চলতি বছর শেষে অনলাইন বাজারের আকার ৪৫ থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তবে পণ্য ছাড়াও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট দেখা, টিকিট কেনাবেচার মতো বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা এবং ভার্চুয়াল পণ্যও কেনাবেচা হচ্ছে ই-কমার্সে। এসব পণ্য ও সেবার অর্ডারের গড় মূল্য ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে। এসব অর্ডারের ৮০ শতাংশই হচ্ছে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বা ‘সিওডি’ হিসেবে। অর্থাৎ গ্রাহক পণ্য বুঝে পেয়ে মূল্য পরিশোধ করার সুবিধায় ই-কমার্স থেকে ৮০ শতাংশ অর্ডার জমা পড়ছে। তবে এখনো এই অর্ডার পুরো দেশের সামগ্রিক খুচরা লেনদেনের মাত্র ১ শতাংশেরও কম। সেই হিসেবে ভবিষ্যতে দেশীয় ই-কমার্স খাতের আরও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামগ্রিক ই-কমার্স বাজার নিয়ে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল কালবেলাকে বলেন, এখন ডিজিটাল ব্যবসার সঙ্গে সবাই জড়িত হচ্ছে। যারা গতানুগতিকভাবে ব্যবসা করত, তারাও ই-কমার্সে আসছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, শুধু অনলাইনে কেনাবেচা করাই ই-কমার্স নয়। সেবা খাতও এর মধ্যে আছে।
তবে এই সম্ভাবনার মধ্যেও খাত সংশ্লিষ্টরা একটি বড় বাধা হিসেবে দেখছেন ইন্টারনেটের বিস্তার না হওয়া, বিশেষ করে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বিস্তৃত না হওয়াকে। এ ছাড়া লজিস্টিক খাতও এখনো সেই অর্থে বড় হয়নি। দেখা যায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো পণ্য ডেলিভারি করা যাচ্ছে না। পোস্ট অফিস পিছিয়ে আছে। ১০ হাজার পোস্ট অফিস আছে দেশজুড়ে, যেখানে ৪০ হাজার কর্মী কাজ করে; কিন্তু সেটিকে পুরোদমে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
ই-কমার্স ব্যবসায়ী নেতা তমাল মনে করেন, ইন্টারনেট যত দ্রুত গতির হবে, যত কম দামের মধ্যে থাকবে—ততবেশি ই-কমার্স বড় হবে। এতে বাড়বে কর্মসংস্থানের পরিমাণও। প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে আগামী দুই বছরে এ খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। দরকার সবার একটু সমন্বিত উদ্যোগ, ইন্টারনেটের প্রসার এবং সরকারের পক্ষ থেকে কিছু নীতিগত সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা।
মন্তব্য করুন