

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এর কোনোটিই ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম, যারা আর এ শাসনের কাছে মাথা নত করতে রাজি নয়।
পশ্চিমা বিশ্ব যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ব্যস্ত, তখন তারা উপেক্ষা করছে ইরানের ভেতরের বাস্তব চিত্র—একটি ক্ষুব্ধ, হতাশ ও পরিবর্তনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নতুন প্রজন্মকে।
৬০ শতাংশ তরুণ, যারা বিপ্লব দেখেনি: ইরানের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই তরুণরা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব দেখেনি। তারা আয়াতুল্লাহ খোমেনির আহ্বানে সাড়া দেয়নি, বা বিপ্লবের স্বপ্নে বড় হয়নি।
এই প্রজন্মের চোখে ধর্মীয় পোশাক, বিপ্লবী স্লোগান বা শহীদের কবর কোনো পবিত্রতার প্রতীক নয়। তারা বড় হয়েছে ভেঙে যাওয়া অর্থনীতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, মুদ্রার ভয়াবহ অবমূল্যায়ন ও ধর্মের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে। তাদের কাছে বর্তমান শাসনব্যবস্থা মানেই ব্যর্থতা।
মাশা আমিনি, একটি প্রজন্মের বিস্ফোরণ: ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাশা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যু ইরানে যে আন্দোলনের জন্ম দেয়, তা শুধু হিজাব বা পোশাকবিধি নিয়ে ছিল না, এটি ছিল একটি প্রজন্মগত বিদ্রোহ।
রাস্তায় তরুণীরা ওড়না খুলে ফেলেছিল শুধু আইন অমান্য করতে নয়, বরং পুরো কর্তৃত্বকেই প্রত্যাখ্যান করতে। আন্দোলনের ভেতর থেকে যে বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—‘আমরা আর এমন প্রজাতন্ত্র চাই না।’
শাসকদের ভয়, তাই দমননীতি: এই বাস্তবতা ইরানের শাসকগোষ্ঠী গভীরভাবে উপলব্ধি করছে। ফলে জনগণের কষ্ট লাঘবের বদলে তারা বেছে নিয়েছে কঠোর দমননীতি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যত সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। জানাজা ও শোকসভাও সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। দেশটিতে ক্রীড়াঙ্গন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে অশান্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোরতা আসলে সরকারের শক্তি নয়, বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।
অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে আসছে: ইরানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটময় হচ্ছে। জন্মহার দ্রুত কমছে, যুব বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী ক্রমেই বয়স্ক ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এটি আর একটি কার্যকর সরকার নয়, বরং একটি ক্ষমতালোভী বয়স্ক গোষ্ঠী, যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হতাশা উপেক্ষা করছে।
ভয় ও মিথে দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্র: ইরানের শাসনব্যবস্থা মূলত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—১. ভয়—বসিজ বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের দমননীতি ও ২. মিথ—বিপ্লব ও বিদেশি শত্রুর গল্প। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, যখন দৈনন্দিন জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মিথ আর টেকে না। আর দমন যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন ভয়ও কার্যকারিতা হারায়।
দুর্নীতি ও ভণ্ডামিতে ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ: দেশটিতে দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ধর্মীয় নেতারা নৈতিকতার কথা বলেন, অথচ তাদের সন্তানরা বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন। কর্মকর্তারা প্রতিরোধের ভাষণ দেন, কিন্তু অর্থ পাচার করেন। সাধারণ মানুষ রুটির লাইনে দাঁড়ায়, আর রাষ্ট্রীয় অর্থ উধাও হয়ে যায়। তরুণ সমাজের চোখে এটি ন্যায়বিচার নয়, বরং ধর্মের আড়ালে লুটপাট।
বিশ্ব রাজনীতির জন্য সতর্কবার্তা: বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ইরান কোনো শক্তিশালী উদীয়মান বিপ্লবী রাষ্ট্র নয়। বরং এটি একটি ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু শাসনব্যবস্থা, যা ভেতরের দুর্বলতা ঢাকতে বাইরে শক্তি প্রদর্শন করছে। ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বা সামরিক সংঘাতে। তা নির্ধারিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে, ছাত্রাবাসে, গোপন অনলাইন আলাপে, সংস্কৃতি ও সংগীতের ভেতর এবং তরুণদের নীরব ও প্রকাশ্য প্রতিবাদে।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী শহর অবরুদ্ধ করতে পারে, মানুষ গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি রক্তও ঝরাতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস ও ভালোবাসা আদায় করতে পারছে না। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে রাষ্ট্র নিজের সন্তানদের কাছেই ঘৃণিত হয়ে ওঠে, সে রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। ইরানের দরজায় এখন সেই ইতিহাসই কড়া নাড়ছে।
মন্তব্য করুন