

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরের দিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সংসদ ভবরে দক্ষিণ প্লাজায় তারা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গার্ড অব অনার দেওয়ার পর জিয়া উদ্যানে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে একটি স্মৃতিচারণ করেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজার দিনের স্মৃতিচারণ কালবেলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
ফেসবুকে মুশফিকুল ফজল আনসারী লেখেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা, সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপকার বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে সকল মত ও পথের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সার্বজনীন ঐতিহাসিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে— যা এই মহান নেত্রীর প্রতি জাতির প্রাপ্য ও ন্যায্য সম্মান। একইসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের ন্যায় ওয়াশিংটন ডিসিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি স্মরণসভা আয়োজন করতে পারা আমার জন্য গভীর গৌরব ও তৃপ্তির বিষয়।’
মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘আমি এই মহান নেত্রীর জানাজায় শরিক হতে পেরেছি। বারবার মনে হচ্ছিল, যদি মেক্সিকোতে আমার কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় এই মর্মান্তিক সংবাদটি পেতাম, তাহলে হয়তো জানাজার আগে দেশে পৌঁছাতে পারতাম না। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সে সময় আমি পবিত্র মক্কায় অবস্থান করছিলাম, ফলে যথাসময়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।’
‘এয়ারপোর্ট থেকে সংসদ ভবনে যাওয়া পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সংসদ ভবনে পৌঁছে দেখি তখনও ম্যাডামের লাশ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সেখানে রাখা। ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা না করে সেখানে উপস্থিত অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে সিদ্ধান্ত নিই। পায়ে হেঁটেই লালমাটিয়ার দিকে জানাজার নির্ধারিত মঞ্চের দিকে রওনা হব।’
‘মইন ভাই (বাংলাদেশ বিমানের প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক) সহ অনেকে গাড়িতে যাওয়ার বিষয়ে জানালেও মনে হলো, বাইরে থেকে এসে হঠাৎ করে নির্ধারিত বাসে উঠে যাওয়াটা ভালো দেখাবে না। তাই হেঁটেই যাত্রা শুরু করি। সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যাই এসএসএফের ম্যাডামের সময়কার প্রাক্তন মহাপরিচালক জেনারেল ফাতমি আহমেদ রুমি ও তার কয়েকজন সহকর্মী, গানম্যানের দায়িত্বে থাকা জাভেদ, চাচাতো ভাই আকিব ও মান্নান।’
‘কিছু দূর যেতেই আমরা লক্ষ মানুষের স্রোতে মিশে যাই। একসময় হারিয়ে যায় সব সঙ্গী-সাথী। মানুষের প্রচণ্ড চাপে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। অথচ বিস্ময়করভাবে, এমন ভিড়ের মাঝেও মানুষ আমাকে চিনতে পেরে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের এই ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে।’
মুশফিক লেখেন, ‘এইভাবেই কোনো রকমে পৌঁছে যাই মূল মঞ্চের কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে ভিড় এতটাই মারাত্মক ছিল যে ধাক্কাধাক্কিতে একপর্যায়ে নিচে পড়ে যাই। এ সময় আমার চাচাতো ভাই আকিব কোথা থেকে ছুটে এসে চিৎকার করে আমাকে তুলতে চেষ্টা করে। হারিয়ে যায় মাথার টুপিটাও। একজন উপদেষ্টার গাড়িও তখন মানুষের স্রোতের ভেতর সামনে আগাতে থাকে। ঠিক তখনই পিজিআরের দায়িত্বরত কয়েকজন আমাকে কর্ডন করে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে এসএসএফের একজন অফিসার এগিয়ে এসে আমাকে মূল মঞ্চের দিকে প্রবেশ করান।’
‘বেশ কিছুক্ষণ পর জানাজার নির্ধারিত স্থানে ম্যাডামের লাশ এসে পৌঁছায়। প্রবল আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি— যদি লাশবাহী কফিনটি কাঁধে নেওয়ার সৌভাগ্য হয়। জানাজা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কফিনের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু কোনোভাবেই সামনে পৌঁছাতে পারছিলাম না।’
‘ঠিক সেই মুহূর্তে ইসলামিক স্কলার মিজানুর রহমান আজহারী– আনসারী ভাই আসেন বলে তিনি কিছুটা পেছনে সরে আমাকে কফিনে স্পর্শ করার সুযোগ করে দেন। এরপর যুক্তরাজ্যের কামাল উদ্দিন ও মিয়া নুরউদ্দিন অপু এমনভাবে সহযোগিতা করেন, যাতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যে কফিনটি কাঁধে নিতে পারি। এই তিনজনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই।’
সর্বশেষ তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কাণ্ডারী, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার লাশ কাঁধে নেয়ার এই সুযোগ আমার জীবনের সম্মানজনক ও আবেগঘন মুহূর্ত। মহান আল্লাহ তায়ালা এই মহান নেত্রীকে তার অশেষ রহমতের চাদরে আবৃত করে রাখুন। আমিন।’
মন্তব্য করুন