আতাউর রহমান 8
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৪, ০৩:০৩ এএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ১১:০৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জীবন গেলেই ‘জীবিত’ হয়ে ওঠে কর্তৃপক্ষ

পদে পদে গাফিলতি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

১৪ বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদাম থেকে লাগা আগুনে অঙ্গার হয়েছিল ১২৪ জন। এরপর ওই এলাকার আবাসিক ভবনে গড়ে তোলা রাসায়নিকের গুদাম সরাতে তোড়জোড় শুরু হয়। দৌড়ঝাঁপ শুরু করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নানা প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসে স্থানীয়রাও আশ্বস্ত হন।

২০১০ সালের জুনের ওই ট্র্যাজেডির পর কর্তৃপক্ষের নানা ‘উদ্যোগে’ পুরান ঢাকার মানুষ বাসযোগ্য এলাকার আশায় বুক বাঁধলেও কিছুই যে হয়নি, ৯ বছর পর ফের জীবন দিয়ে সেই প্রমাণ দিতে হয়েছে এলাকার লোকজনকে। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ যায় ৭১ জনের। তদন্তে বেরিয়ে আসে ভবনের নিচে হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে সৃষ্ট আগুন ওপরের তলাগুলোতে রাখা রাসায়নিকের গুদামের কারণে তীব্রতা ছড়িয়ে এত প্রাণহানি হয়েছে।

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর ফের অভিযান শুরু হয় পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর। কিন্তু তা যে হয়নি, ২০২১ সালের এপ্রিলে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় আবাসিক ভবনে লাগা আগুনে প্রাণ যায় পাঁচজনের, দগ্ধ হন আরও অন্তত ১৫ জন। ওই ঘটনাতে বেরিয়ে আসে ভবনটির নিচতলায় ছিল রাসায়নিকের গুদাম আর দোকান।

এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটিও করেছিল নানা সংস্থা। থানায় মামলাও হয়েছিল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই তদন্তের সুপারিশগুলো রয়েছে ফাইলবন্দি হয়ে, মামলা হলেও বিচার পায়নি হতাহতের পরিবার। ততদিনে রাসায়নিকের গুদাম অপসারণের দৌড়ঝাঁপও থেমে গেছে। তবে এখনো ডুকরে কাঁদছেন স্বজনহারা মানুষরা।

অবহেলা আর গাফিলতি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে—সেটা গত বৃহস্পতিবার বেইলি রোডে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামে আটতলা ভবনে ভয়াবহ আগুনে নারী-শিশুসহ প্রাণ গেছে ৪৬ জনের। ওই ভবনটির তলায় তলায় রেস্তোরাঁ। এতদিন সবকিছু চোখের সামনে থাকলেও এত মানুষের প্রাণ নেওয়ার পর বেরিয়ে আসছে ভয়ংকর তথ্য। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ওই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ছিল না; সরু সিঁড়িতে রাখা ছিল গ্যাস সিলিন্ডার। এতে আগুন লাগার পর লোকজন বের হতে পারেনি। রাজউক অবশ্য আর একটু এগিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে, ‘ভবনটিতে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁগুলোর অনুমোদনই ছিল না!’ প্রশ্ন উঠেছে, এই যে এটা ছিল না, ওটা ছিল না—এগুলো দেখার দায়িত্ব কার? প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্বজনরা বলছেন, সবকিছু ঠিকঠাক নিয়মে থাকলে হয়তো তাদের স্বজন হারাতে হতো না।

গ্রিন কোটি কটেজে অবস্থিত রেস্তোরাঁগুলোর ট্রেড লাইসেন্স ছিল। কিন্তু ভবনটিতে রেস্তোরাঁ চালুর অনুমোদন না থাকলেও সিটি করপোরেশন সেখানে ব্যবসা চালাতে ট্রেড লাইসেন্স কীভাবে দিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, কোনো জবাবদিহি নেই, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এজন্য অগ্নিকাণ্ড বা মানুষ মারার ফাঁদ যারা তৈরি করে তারা রক্ষা পাচ্ছে। এগুলো যাদের তদারকি করার কথা, অনিয়ম বন্ধ করার কথা, তারা তা করছেন না। ফলে প্রাণহানি ঘটলে কিছুদিন দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। তিনি বলেন, জবাবদিহি বা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেছেন, নানা ঘটনায় প্রাণহানির পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। কিন্তু এই যে অব্যবস্থাপনা-অনিয়মের কারণে একেকটা ভবন মৃত্যুকূপ হয়ে রয়েছে। এটা এক দিন-দুদিনে হয়নি। এগুলো দেখার তো পৃথক পৃথক লোক রয়েছে। তারা তো কিছুই করছে না। ফলে মানুষ মরছে। এরপর লোক দেখানোর জন্য কিছু একটা করা হলেও চূড়ান্ত অ্যাকশনে যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, মানুষজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার সঙ্গে যাদের অবহেলা, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো অ্যাকশন নেই। এজন্যই একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।

অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তারা যে নিচ্ছেন না, বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের মামলায় সেই চিত্র ফুটে উঠেছে। পুলিশের দায়ের মামলায় বলা হয়েছে, ‘ভবনটির মালিক/ম্যানেজার রাজউকের দোকান পরিদর্শকদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে সেখানে রেস্টেুরেন্ট স্থাপন করে গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার ব্যবহার করে আসছিল।’

শুধু নিমতলী, চুড়িহাট্টা বা বৃহস্পতিবার বেইলি রোড ট্র্যাজেডিই নয়—গত বছরের ৫ মার্চ সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিরিন ভবন নামে একটি ভবন ধসে পড়ে তিনজন প্রাণ হারায়। এরপর তদন্তে বেরিয়ে আসে, ভবনটিতে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে সেটি ধসে পড়ে হতাহত হয়েছে। এরপর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। অবশ্য এর দুদিন পরই পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার এলাকায় পাঁচতলা একটি ভবন ধসে পড়ে। এতে পথচারীসহ প্রাণ যায় ১৮ জনের। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই ভবনের ব্যাজমেন্টে পুরোনো খাবার হোটেলের বন্ধ করে দেওয়া তিতাস গ্যাসের লাইন লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে ভবনটি ধসে পড়ে। এসব ঘটনার পর গ্যাস লাইনের লিকেজ খুঁজতে দৌড়ঝাঁপ দেখা গেছে। যদিও এক বছরের মধ্যেই তা থেমে গেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জিয়া পরিষদের এক সদস্যকে গলা কেটে হত্যা

আমিও আপনাদের সন্তান : তারেক রহমান

মায়ের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না : লায়ন ফারুক

সিলেটে কঠোর নিরাপত্তা

জনসভা সকালে, রাত থেকে জড়ো হচ্ছেন নেতাকর্মীরা

আগামী প্রজন্মকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান সেলিমুজ্জামানের

শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ধানের শীষে ভোট চাইলেন তারেক রহমান

বিএনপির নির্বাচনী থিম সং প্রকাশ

ক্রিকেটারদের সঙ্গে জরুরী বৈঠকে বসবেন ক্রীড়া উপদেষ্টা

শ্বশুরবাড়িতে তারেক রহমান

১০

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ঢাকায় আসছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৭ সদস্য

১১

সোনাগাজী উপজেলা ও পৌর বিএনপির সঙ্গে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মতবিনিময়

১২

মেহেরপুরে জামায়াতের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ

১৩

শ্বশুরবাড়ির পথে তারেক রহমান

১৪

ভোজ্যতেলে পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে হবে

১৫

পে-কমিশনের প্রস্তাবে কোন গ্রেডে বেতন কত?

১৬

নারায়ণগঞ্জে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

১৭

শাহজালালের মাজার ও ওসমানীর কবর জিয়ারত করলেন তারেক রহমান

১৮

বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

১৯

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন মারা গেছেন

২০
X